ফিজিতে দিন কয়েক
৩
ডোমেস্টিক উড়ানের সময় ছিল সাতটা দশ মিনিটে, নাডি থেকে সুভা, আমাদের যাত্রাপথের শেষ বিন্দু। সঙ্গের ম্যাপটা যদি ভাল করে দেখা যায়, তাহলে এই উড়ান পথ হল উত্তর -পশ্চিম কোন থেকে, পুরো দ্বীপটিকে আধা আধি কেটে দক্ষিণ- পুর্ব কোণে। এই পথটুকু ড্রোনিয়ার ফ্লাইটে (২৬ সিটের) কভার করতে সময় লাগবে, আধ ঘনাডি (Nadi) হলো ওশেনিয়া অঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি-র প্রধান প্রবেশদ্বার এবং তৃতীয় বৃহত্তম শহর। এটি ফিজির প্রধান দ্বীপ 'ভিতি লেভু' (Viti Levu)-এর পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি এই শহরেই থাকায়, ফিজিতে আসা প্রায় সমস্ত পর্যটকদের প্রথম পদক্ষেপ বা ট্রানজিট পয়েন্ট হয় এই নাডি শহর।পর্যটন ও আখ চাষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই শহরটি তার বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ, চমৎকার আবহাওয়া এবং স্থানীয় আতিথেয়তার জন্য পরিচিত।সুভা হলো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ফিজির রাজধানী, বৃহ এবং প্রধান বাণিজ্যিক ও বন্দর কেন্দ্র।
যদিও সুভাতে, তার নামে কোন এয়ারপোর্ট নেই। আমরা নামব "নওসরি" বলে একটি বিমানবন্দরে। ভারতে, গুজরাটে, নাওসারি বলে, সুরাটের কাছে, একটি জায়গা আছে- যেখানে 'সেকেন্ড হ্যান্ড কার' এর খুব বড় বাজার আছে। এই লেখার সাথে সুভার একটি ভৌগলিক ম্যাপ দিয়েছি - যাতে নওসরির অবস্থান দেখান হয়েছে। ওইখান থেকে, প্রিন্সেস রোড ধরে, গাড়িতে আমরা এলাম সুভার, ওয়াইলোকু বলে একটি স্থানে, যেখানে আমার মেয়ের বাড়ি।
নওসরি তে নেমে, এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে, আগে থেকে ডেকে রাখা, ব্ল্যাক টয়োটা করোলা, আমাদের পিক আপ করে নেয়। ইন্দো- ফিজিয়ান ড্রাইভার- ইংরাজী এবং হিন্দী দুটোই বলতে পারে। প্রায় ২৫ ডলারের মত মিটারে দেখাচ্ছিল। সময় লেগেছে প্রায় ৪০ মিনিট মত।
সিনু, আমার ছোট জামাই, রাস্তাতেই তাদের পোষ্যটিকে নিয়ে, তার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিল। আমাদের গাড়ি দেখে, সেও ফিরে আসে, "ফিতুর"-কে সাথে নিয়ে। ফিতুরের সাথে আমার প্রাথমিক আলাপ পরিচয়, বেশ খানিকটা ' who are you, entering my area' গোছের হলেও, ধীরে ধীরে তা শান্তই হয়ে যায়। আজকে এই লেখার সময়, ও আমার পাশে বসে আছে চুপ করে।
এত্ত বড় লম্বা জার্নি সফল ভাবে করতে পারার জন্য, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। একটু কনফি ভেতরে আসছিল। যাই হোক, আজ লম্বা রেস্ট নিতে হবে। সাড়ে ছয় ঘন্টার সময়ের আগে চলায়, ঘুম, বাথরুম এবং জেট ল্যাগ সব কিছু অ্যাডজাস্ট করতে আজ আর আগামীকাল লাগবে। এখানে আসার ঠিক আগে, ভার্টিগো-র মাইল্ড সিমপটন দেখা দিয়েছিল। তার জন্য দিনে রাতে মিলিয়ে, পাঁচ দিনে ১৫টা ভার্টিন-১৬ খেতে বলেন। আমি অবশ্য, খাই নি। লম্বা জার্নির আগে ১ খানা মাত্র।
যাক গে, স্নান করে, কিছু খেয়ে, আমি আমার জন্য নির্দিষ্ট করে গুছিয়ে রাখা ঘরে, বিছানায় চলে আসি। আপনা থেকেই ঘুম এসে যায় - যা আমার জন্য অপ্রত্যাশিত। কি জানি, ঘরের ভাইব খুব পজিটিভ অনুভুত হচ্ছিল।
শেষ বিকেলে ঘুম ভাঙে। চা পান হল। জায়গাটা নিয়ে আলোচনা, সামনে কি কি এবং কোথায় প্রোগ্রামে যাওয়া হবে, তাই নিয়ে কিছুটা আলোচনা হল। বড় মেয়ে, অ্যাডিলেড থেকে, এই মাসেরই ১৯ তারিখ ফিজি আসছে। আমার সাথে দেখা করার জন্য। সত্যি, এমন ক'জন বাপের ভাগ্যে হয়। আমার সত্যিই আর কিছু চাইবার নেই ঈশ্বরের কাছে - শুধু যদি, আমার সহযাত্রীনী, আমার স্ত্রী-ও এই মওকায় হাজির থাকতেন, তাহলে ১৬- কলা পূর্ন হত। মানুষ ভাবে এক, ঘটে আরেক। এই আমাদের নিয়তির বিধান। জানি না, ঈশ্বরের সকল কাজ ভালোর জন্যেই হয়- আমরা তো পুতুল মাত্র- তবে এই বেদনার সুরে ভরা মিলনের ঘটনা, কি ভাল আনবে, কার জন্যে? ঈশ্বরই জানেন।
পরের দিন আবহাওয়া বৃষ্টি বাদল ভরা ছিল। ছোট মেয়ে সকাল সাড়ে আটটায়, অফিস বেরিয়ে গেল। আমি আটটায় উঠে গেছিলাম এবং গুড সাউন্ড স্লিপের পর। কলকাতায় এমন ঘুম হয় না কেন? কে জানে!
আজকে ঘরেই থাকা। সকালে আমার স্পন্ডিলাইটিসের সামান্য অসুবিধা হচ্ছিল, মাথা, ডাইনে- বাঁয়ে ঘোরাতে গিয়ে। তাই রেস্ট ডে করা হল।
বাড়িতে বসে, চা বিস্কুট খেয়ে, ভাবলাম, কেখা শুরু করব, এই চলতি বেড়ানো নিয়ে। তাই ফিজি সম্বন্ধে, মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে যা বইপত্র পেলাম,তাই নিয়ে নাড়া চাড়া শুরু করি। কিন্তু ভূতত্ত্বের পোকাটা সব সময়ই সজাগ থাকে - সেটা সেন্টোরিনি হোক, কি সুভা অথবা হংসেশ্বরীর কাছে ত্রিবেণী ঘাট। ফিজি সেই তুলনায়, জিওলজিক্যালি বিশেষ প্রাইম জায়গা।
আমি বুঝি, পাঠকের এই জিওলজি নিয়ে কোন আগ্রহ নেই, এই অংশটা তারা বাদই দেবেন। কিন্তু আমি ভূতত্ত্বের কাছে অন্তহীন ভাবে ঋণী- তাই যে ল্যান্ডমাসে এসে নেবেছি, থাকছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি, গত চার বছর ধরে, আমার মেয়ে এখানে কাজ করছে - সেই দ্বীপের জন্ম রহস্য, জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে সামান্য উল্লেখ রাখা দরকার। আমি চেষ্টা করছি, সাবজেক্টের জারগন বাদ দিয়ে, সাধারণ ভাবে বলতে।
ফিজি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে, নিউজিল্যান্ডের উত্তর-পূর্বে এবং হাওয়াইয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি অন্য কোন দেশের সাথে স্থল সীমানা ভাগ করে না। দেশটি প্রায় ১৮,২৭৪ স্কো.কিমি (৭,০৫৬ স্কো.মাইল) এলাকা জুড়ে রয়েছে। দুটি বড় দ্বীপ নিয়ে - প্রধানত: ফিজির ভৌগলিক অবস্থান। ভিটি লেভু আর ভানুয়া লেভু।
ভিটি লেভু: ভিটি লেভু হল ফিজির বৃহত্তম দ্বীপ, যা দেশের মোট ভূমির অর্ধেকেরও বেশি। এই অঞ্চলটি ১৩২৪ মিটার (৪৩৪৪ ফুট) এ দাঁড়িয়ে থাকা দেশের সর্বোচ্চ শিখর, মাউন্ট টোমানিভি সহ একটি কেন্দ্রীয় পর্বতশ্রেণী সহ একটি রুক্ষ ভূখণ্ড দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বীপের পূর্ব দিকে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়, যা গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইনফরেস্টকে সমর্থন করে। বিপরীতে, পশ্চিম দিকে, মধ্য পর্বতের বৃষ্টির ছায়ায়, শুষ্ক তৃণভূমি এবং আখের ক্ষেত রয়েছে। অবশেষে, সিগাতোকা নদী ফিজির অন্যতম প্রধান নদী এবং এটি এই দ্বীপের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
ভানুয়া লেভু: ভিটি লেভুর উত্তরে ফিজির দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ ভানুয়া লেভু অবস্থিত। ভিটি লেভুর তুলনায় কম পাহাড়ি হলেও এই দ্বীপের অভ্যন্তর রুক্ষ। ভানুয়া লেভুতে সবচেয়ে বড় ড্রেকেটি নদী তার ল্যান্ডস্কেপের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে। ভানুয়া লেভুর উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন রয়েছে, এবং তার আশেপাশের জলে, ছোট ছোট প্রবাল প্রাচীর রয়েছে। দ্বীপটির অভ্যন্তরীণ অংশটি মূলত: গ্রীষ্মমন্ডলীয় রেইনফরেস্ট এবং নারকেল বাগানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল হিসাবে পরিচিত, যা নিয়ে ফিজিয়ানিরা গর্ব করে।
কিন্তু সুবিশালসাবডাকশন-সম্পর্কিত আগ্নেয় দ্বীপমালা—অর্থাৎ একটি মহাসাগরীয় প্লেট অন্য একটি প্লেটের নীচে ঢুকে যাওয়ার ফলে ম্যান্টলে উৎপন্ন ম্যাগমা ওপরে উঠে আগ্নেয় দ্বীপ( volcanic island) ও দ্বীপ-আর্ক(island arch) তৈরি করেছে। পরে আগ্নেয় শিলাগুলিতে ক্ষয়( erosion),ভূত্বকের ওঠানামা, সমুদ্রতলের বিস্তার, চুনাপাথর ও প্রবালপ্রাচীরের গঠন—এই সব প্রক্রিয়া ফিজির বর্তমান রূপ নির্ধারণ করেছে। ফিজির প্রাচীনতম identified শিলা প্রায় ৩৫–৪০ মিলিয়ন বছর পুরোনো, অর্থাৎ ভূতাত্ত্বিক টাইম স্কেলে Late Eocene যুগের।
ওয়ান মিলিয়ন = ১,০০০,০০০ অর্থাৎ দশ লক্ষ বছর।
তার মানে, আজ থেকে (৩৫- ৪০)xদশলক্ষ = ৩,৫,০০০,০০০ বছর আগে, প্রশান্ত মহাসগরীয় পৃথিবীর এই অংশে ফিজি দ্বীপপুঞ্জ, আগ্নেয়গিরি দ্বারা প্রসূত হয়েছিল। অর্থাৎ সাড়ে তিন কোটি বা ৪ কোটি বছর আগে।
লেট ইওসিন (৫৬-৩৫ মিলিয়ন বছর আগে): প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্লেট, অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের নিচে ধাক্কা দিয়ে পশ্চিম ভিটি লেভুতে গঠিত প্রাচীনতম দ্বীপ-আর্ক আগ্নেয় শিলা।
অলিগোসিন এবং মাইয়োসিন (৩৪-৫.৩ মিলিয়ন বছর আগে): গভীর ভূত্বক কার্যকলাপ, কোলো প্লুটোনিক স্যুটের মতো ম্যাগম্যাটিক অনুপ্রবেশ এবং প্লেটের সীমানা স্থানান্তরিত করার ফলে মূল ল্যান্ডমাসগুলিকে আকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
প্লাইয়োসিন থেকে প্লাইস্টোসিন (৫.৩ মিলিয়ন–১১,৭০০ বছর আগে): টেকটোনিক উত্থান প্রাচীন প্রবাল প্রাচীর এবং পাললিক আমানতকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে ঠেলে দিয়েছে।
হোলোসিন (১১,৭০০ বছর আগে থেকে আজকের বর্তমান): আধুনিক প্রবাল প্রাচীর এবং উপকূলীয় সমভূমি বিকশিত হয়েছে। কিন্তু সেই সক্রিয় আগ্নেয়গিরির কার্য্যকলাপ এখনও তাভেউনির মতো দ্বীপগুলিতে অব্যাহত রয়েছে।
ফিজি দ্বীপপ৩৩২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত। জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ: এর মধ্যে প্রায় ১০৬টি দ্বীপে মানুষ বসবাস করে।
প্রধান দ্বীপসমূহ: ফিজির সবচেয়ে বড় দুটি দ্বীপ হলো ভিটি লেভু (Viti Levu) ও ভানুয়া লেভু (Vanua Levu)।
আশা করি, পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় নি। সাড়ে তিন কোটি বৎসর আগে, যে দ্বীপ সমুদ্রের জলরাশির ওপরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল, তাতে বসবাসের জন্য মানুষ পৌঁছেছে, মাত্র ৩৮০০- ৩৫০০ বৎসর আগে। ভাবা যায়? সেই রকম এক স্থলভূমিতে, আমি এসেছি। থাকছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি। পৃথিবীর কাছে, এই প্রাপ্তি, একরকম আমার ঋণই বটে। ফিজির মানুষের অতীত, তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক ছিঁটে কষ্ট- মেহনত,অসুখ, অত্যাচার, কিছু না সয়েই, আমি এখানে রাজার হালে ঘুরে বেড়াচ্ছি।