আমরা এগারো বারো ক্লাস কলেজে পড়েছিলাম। কলেজের বড় অডিটোরিয়ামে প্রায় শ খানেক ছেলেমেয়ে বসে পড়া শুনতাম।
সেদিন বাংলার ক্লাসে ভারি গোলমাল হচ্ছিল। বিশেষত পেছনের দিকে। প্রভাত বাবু হঠাৎ তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠে বলে উঠলেন "আজকের এত কথা, কোনদিন বুঝি হয়ে যাবে কথকতা"... ' কথকতা' টায় বেশ একটা টান দিয়ে। আশ্চর্য ভাবে পুরো ক্লাস এক্কেবারে চুপ করে গেল! ছোট্ট একটা কথা একশ মানুষকে ভাবিয়ে তুলল বোধহয়।
কথা ত কতই আছে। কতরকম আছে। কতভাবে যে একই কথা বলা যায়! কথাদের বোধহয় নিজস্ব একটা প্রাণ থাকে, ভাব থাকে। যিনি কথা বলছেন তাঁর ভাবের ওপরে কথার নিজস্ব একটা মাত্রা বোধহয় কাজ করে। সেটা কেমন মাত্রা, কতটা জোরালো সেটা নির্ভর করে যিনি শুনছেন তাঁর ওপরে। অর্থাৎ, কথার মালিক দুজনেই, যিনি বলছেন আর যিনি শুনছেন। ধরা যাক সহজ ভাবে কাউকে জিজ্ঞাসা করা হল "আজকাল কী করছ?" এবার তিনি এই কথাকে কেমনভাবে বুঝবেন সেটা খানিকটা নির্ভর করে সত্যিই তিনি আজকাল কী করছেন তার ওপরে।
হারামজাদা একটি খারাপ কথা। কেন এই শব্দ বাছলাম বলি। সানি দেওলের কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎই। তিনি যখন রাগে অন্ধ হয়ে খলনায়ককে এই খারাপ কথাটি বলেন, তখন যাঁরা যাঁরা শুনছেন তাঁদের সবারই রক্ত গরম হয়ে যায়। আবার ওই সানিই যখন মিষ্টি সুরেলা টানে প্রেমিকাকে জিজ্ঞাসা করেন "কেয়া কাহা উস হারামজাদে নে?" তখন যার উদ্দেশ্যে এই বিশেষণটি বলা সে নিজের কানে শুনলেও বোধহয় প্রায় গলে যায়।
কথা মনের ভাব প্রকাশের হাতিয়ার। প্রেম, স্নেহ, রাগ, ঘৃণা, ঔদাসীন্য... যে কোনো ভাব প্রকাশের রাস্তা। আবার ভেবে দেখলে ভাব গোপন করারও নয় কি? বুঁচকির কথাই ধরা যাক না! সে মুখে বলল "যাঃ" কিন্তু "হ্যাঁ" বলার ভাবটুকু গোপন রাখতে চাইল। অবশ্য শোনার মানুষ বুঝে নিল যে "যাঃ মানেই হ্যাঁ"।
কথার মারপ্যাঁচ অনেক। যাঁরা কথা বলেন এবং শোনেন তাঁরা জানেন। যাঁরা বলেন না, বলতে পারেন না, তাঁদের কি কথা নেই? যাঁরা শুনতে পারেন না , তাঁরা কি কথা বোঝেন না? সেখানে কথা হয় ইঙ্গিতে। ইঙ্গিতেই ভাব বিনিময় হয়। অবশ্য যাঁরা কথা বলতে পারেন তাঁরাও যে ইঙ্গিতে কথা বলেন না এমনও ত নয়। ছোটবেলায় অতিথির সামনে দুষ্টুমি করলে মায়ের চোখে এরকম ইঙ্গিত পাননি এমন মানুষ কম। তেমনি একটি ছোট্ট ইঙ্গিতে হৃদয় উথালপাতাল হয়ে যাওয়ার উদাহরণও কম নয়। সেই কথাগুলি নির্বাক হলেও যথেষ্ট অর্থবহ নয় কি?
আর একরকম কথা আছে যেখানে বলার ও শোনার মানুষ একই। সেটা নিজের সঙ্গে নিজের কথা। কমবেশি সবাই এরকম কথা বলে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বাক। কখনও কখনও সবাকও। নিজের সঙ্গে সবাক কথা বলার মধ্যে কোথাও একটা ছায়া ছায়া ভাব আছে বলে মনে হয়। নিজের সঙ্গে নির্বাক কথা বলাকে যদি ভাবনা বলি, তাহলে সবাক কথা বলাকে হয়ত বা যন্ত্রণা বলা চলে। যাঁরা জানেন তাঁরা বুঝবেন।
কথার কচকচি থামাই। কথকঠাকুরের কাজ ত আমার নয়! তাই কথা কথকতায় পরিণত হওয়ার আগেই ইতি টানি। তবে যে দু চার লাইন প্রলাপ লিখে রাখতে গিয়ে এত কথা ভুসভুসিয়ে উঠে এল সেটি নিচে রইল।
যখন তখন
কথোপকথন
কথায় কথার
এ অনুরণন
গভীরে থাক
থাক সগোপন।।
এ কথা ভালবাসার কথাও হতে পারে। আবার কাউকে গোপনে খারাপ কথা বলার ইচ্ছেও হতে পারে। নির্ভর করবে কে শুনছেন তাঁর ওপর।