ফিজিতে দিন কয়েক
১
খুব ছোটবেলায়, জাপানে, ফুজি পর্বতের ছবি- আর পাহাড়ের নীচে বুলেট ট্রেন দৌড়াচ্ছে - এমন পোস্টকার্ড ছবি আমরা সকলেই কম বেশি দেখেছি। তারপরে এসেছে, ফুজি ফিল্ম - যখন একটু বড় হই। তারও অনেক পরে, ফিজি আইল্যান্ডের কথা জানতে পারি - যখন অ্যাক্টিভ আগ্নেয়গিরি বেল্টের সম্বন্ধে নিজের সাবজেক্টের পড়াশুনো করছিলাম। কিন্তু জীবনে কখনও ভাবি নি, প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে লালিত পালিত, এই আগ্নেয়গিরি প্রসূত দ্বীপভূমিতে সশরীরে কখনও ঘুরতে আসব।
আমার মত অতি সাধারণ, মিডিওক্যার, মধ্য মেধার মানুষের জীবনেও কিছু কিছু অবিশ্বসনীয় ঘটনাক্রম ঘটে গেছে - যা অনেকের ভাগ্যে সম্ভব হয় না। কোথায়, কি ভাবে জন্মেছিলাম, কোথায় বারো ঘর তেরো উঠোনে বড় হতে হতে, একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই যাই। ঠিক ঠাক না দাঁড়ানোর একটা আশঙ্কা সব সময়ই বাবা-মা'র মনে ঘর করে ছিলই। তাই আমি সব সময়ই আমার সামান্য সফল হওয়াকে দৈব যোগ এবং মহানুভব ঈশ্বরের কৃপা বলেই মনে করে এসেছি। এতে আমার কোনও ক্রেডিট নেই।
কিন্তু কলকাতা থেকে ১০০০০ মাইলের বেশি দূরত্ব উড়ে এসে, ফিজি-তে, আমার পদার্পণের একমাত্র কারণ আমার ছোট মেয়ে ও জামাই। ভূতত্ত্ব আমার পড়াশুনো এবং চাকরি, উভয়েরই বিষয় বস্তু হওয়ায়, তারা আমাকে তাদের বর্তমান কর্মস্থল, ফিজি আইল্যান্ডে, আমাকে নিয়েই আসে শেষ পর্যন্ত। এই লেখায় আগে বলার চেষ্টা করব, ফিজির ভূতাত্ত্বিক অদ্ভুত জন্ম বৃত্তান্ত। ফিজিতে আসবার ইচ্ছে বা লোভ একটা মনের মধ্যে থাকলেও, নিজের শরীরের ওপরে ভরসা করে, এতদূরের পাড়ি জমানোর সাহস জোটাতে পারছিলাম না। দু দুবার যাব যাবনা হয়েছে। ফিজির ব্যাপারে, আমার এই পরিবর্তনশীল মনের তল খুঁজে আমিও পাই নি- কিন্তু মূল কারণ অজানার প্রতি ভয়, দূরত্বের জন্যে ভয়, আর সবচেয়ে মূল যেটা, তা হল গিন্নীকে সাথে না নিয়ে, একা পাড়ি দেওয়ার একটা অনির্ভরতা।
শেষে দুই মেয়েই বলে, তোমার এখনকার ফিজিকাল উপস্থিতি থেকে মা'কে কিছুদিন মুক্ত করে দাও। দুজনে দুজনের মত আলাদা থেকে দেখ, নিজের মত করে বাঁচার রাস্তা খুঁজে দেখ। তবুও চেষ্টা করেছিলাম, দুজনেই আসব বলে। কিন্তু দশচক্রে ভগবানও একবার ভূত হন, আমি তো ছাড়, পাতি লোক। সেই রকমই পাকে চক্রে আটকে গিয়ে, অবশেষে মেয়ের সাথে ফিজির জন্য মনকে প্রস্তুত করতেই হল। মানে করেই ফেললাম আর কি।
সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখে, রবিবার সন্ধ্যাবেলায়, আটটা নাগাদ, আমি আর আমার মেয়ে, বরানগরের বাসা থেকে, দমদম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। মনের মধ্যে দ্বিধার আর ভয়ের দোলচাল সমানেই চলছিল। কিন্তু গুরুজনেরা বলে গেছেন- ভবিষ্যত যখন জান না, তাকে কন্ট্রোলও করতে পারবে না, তখন হে বৎস, বর্তমানকে ধরে চল। তাকে মনে রাখার মত করে অতীত বানাও। তাকে সুখের ভবিষ্যত আশায়, আজ রোপণ করে যাও। গিন্নীকে সাথে না নিয়ে, এত বড় দূরত্বে আমি এর আগে কখনও পা বাড়াই নি। আর হয়ত বাড়াবোও না।
আমাদের ওয়েব চেকিং মেয়ে আগেই করে নিয়েছিল। কিন্তু ইমিগ্রেশান বলে একটা দরজা আছে, যা দেশ ছেড়ে বা দেশে ফিরতে, অবশ্যই পার হতে হয়। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ওয়াই ক্যাটিগরিতে, মেয়ে পড়ে- আর তাই প্রিভিলেজড কাউন্টারে, আমাদের টিকিট, মালপত্র জমা নেওয়া খুব তাড়াতাড়িই হয়ে গেল। কাজের খাতিরে মেয়ে ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লায়ার - তাই এইসব ক্লাস আর ক্যাটেগরির সুবিধা। বর্তমান পৃথিবী একেবারেই অন্য রকম। সেই সুবিধাতে, অনুরোধ করে, কলকাতা- সিঙ্গাপুর- নাডি এই লম্বা জার্ণিটার আলাদা আলাদা বোর্ডিং পাস, সে কলকাতার কাউন্টার থেকেই বের করে নিল। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে, একজন সৌম্য চেহারার ব্যাক্তিত্ব কয়েকটি প্রশ্ন-উত্তরের পরে, ছবি তুলে, পাসপোর্টে ছাপ দিয়ে - আমাদের দেশ ছেড়ে বাইরে যাবার ব্যাপারে পাকাপাকি ভাবে মোহর লাগিয়ে দিলেন। কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল বিমান বন্দরের, ইন্টারন্যাশনাল উইংটা সত্যিই বেশ গোছানো এবং তৎপর। দেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, এইসব মানুষের কাজের ডেডিকেশন দেখে, মনে মনে গর্বিত হই।
আমাদের ফ্লাইটের ওড়ার কথা রাত এগারোটা চল্লিশে। সিঙ্গাপুরে পৌঁছাবে পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। কলকাতার থেকে সিঙ্গাপুরের সময় আড়াই ঘন্টা এগিয়ে।
SQ-0517 ছিল আমাদের ফ্লাইট নম্বর। সময় মতই, সেই বিমান আকাশে পাখা মেলে তার যাত্রাপথে রওয়ানা হয়। এই এত বড় লোহার পাখীটা, তার পেটের ভিতরে জানমাল এব্বগ জ্বালানী নিয়ে অক্লেশে উড়ে গেল মাটি ছেড়ে আকাশে। ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে, এর আগে, বেশ কয়েকবার উড়বার অভিজ্ঞতা ছিল। ঠিক সেইমতই সব কিছু হচ্ছিল। রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ ডিনার সার্ভ হল - গরম গরম। আমি ভেজ খাই বাইরে। সেফ থাকা যায়। ডাল সবজী ভাত, লাচ্চা পরোটা একটা, রেড ভেলভেট কেকের একটা বড় খন্ড, দই, আচার, পাপড় - আর কি চাই? খিদে পেয়েছিল- খেয়েও নিলাম। তারপরে ঘুম ঘুম মানে ঘুমের চেষ্টা। আমার আবার রাতে অনেক ওষুধের ব্যাপার আছে - সব মিলিয়ে জমজমাট রাত্রি জার্নি চলতে থাকে। কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর আসতে, আমাদের মোট দূরত্ব অতিক্রম করতে হল ১৮৩২ মাইল।
সিঙ্গাপুরে পৌঁছে, আমরা এয়ারপোর্ট লাউঞ্জেই থাকি। বাইরে আর যাই নি। কলকাতার ফ্লাইট আমাদের টার্মিনাল -৩ এ নামিয়ে দেয়। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, আমরা ট্রেন ধরে চলে আসি টার্মিনাল-১ এ। এই টার্মিনাল থেকে, আমাদের ফিজি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ধরতে হবে, যা ছাড়বে দুপুর ০১-৫০ মিনিটে। এই ফ্লাইটে আমাদের টিকিট ছিল বিজনেস ক্লাসে। লাউঞ্জে আমরা স্নান বাথরুম করে ফ্রেশ হয়ে যাই। লাউঞ্জে যা কিছু খাও, কোন পয়সা লাগবে না। মিনি ব্রেকফাস্ট করে, আমরা রেস্ট করতে থাকি, পরের ফ্লাইটের জন্য।
ক্রমশ...