ফিজির জন্য, সিংগাপুর টার্মিনাল-১এ, আমাদের ফ্লাইট গেট নম্বর ছিল ১০। আমাদের লাউঞ্জ ছিল, গেট নম্বর ২৫ এর কাছে। এই পুরো দূরত্বটুকু আমাদের হেঁটে পার করতে হবে। কিন্তু সিংগাপুর আধুনিক টেক শহর। তাই সামান্য হাঁটা আর বাকিটা সচল রাস্তায় ব্যালেন্স রেখে ওঠা নামা করে অবশেষে ১০ নম্বর গেটের কাছে পৌঁছে যাই। ফ্লাইট নম্বর FJ362, ফিজি এয়ারলাইন্সের বিশাল এয়ার বাস বিমান। বিমানের ভেতরে পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত আইডিয়া ছিল না- যে আমরা বিজনেস ক্লাসে যাচ্ছি। এই উড়ান প্রায় ১০ ঘন্টার মত টানা - সিংগাপুর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপের *নান্ডি* বিমান বন্দরে নামা পর্যন্ত ৮৩৮২ মাইল পথ পাড়ি দেবে। অস্ট্রেলিয়ার এক্সট্রিম নর্থের খানিকটা ল্যান্ড ( যেটা Cairns এবং ডারুইন এর অন্তর্গত) ছাড়া, বাকি সারা পথটাই সমুদ্রের উপর দিয়ে। সমুদ্রের নীচে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ এই যাত্রাপথের, দক্ষিণে থেকে যাবে। ইকুয়েটরের লাইন এর সাথে ১০ ডিগ্রি কোণ নিয়ে পুরো উড়ান পথ সমুদ্রের বুক চিরে - সোজা নিয়ে যাচ্ছে, আমাদের গন্তব্যে।

দুপুর একটা বেজে দশ মিনিটে, বোর্ডিং শুরু হয়, প্লেনে, টিকিটের সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট অনুযায়ী। বিজনেস ক্লাসের লোক কমই ছিল - তাই আমাদের লাইন দিতে হয় নি। অবাকই হচ্ছিলাম, আমাদের আলাদা কেন ডাকল! যাই হোক,প্লেনের গেটে, হাওয়া সেবিকা বোর্ডিং পাস দেখতে চাইলে, আমি কলকাতা থেকে সিংগাপুরের পাসটা তাকে দেখাই। সে ঘাবড়ে গিয়ে কিছু একটা ইংরাজীতেই বলে - আমি বুঝতে পারি না, উচ্চারণ আর ডিকশনের কারুকার্যে। আমার মেয়ে পিছনেই ছিল - সে শুধরে দেয় আমাকে। ঠিক বোর্ডিং পাস দেখাতে, সুন্দর হেসে, আমাদের দুজনকে, নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দেন সেই মহিলা। এই প্লেনের সেবক সেবিকা সকলেরই বলিষ্ঠ গঠন- কিন্তু ভীষণ ভাল মধুর ব্যবহার। মেয়ে সেবিকাদের একটি কানে একটি করে কাঠগোলাপ লাগানো। মেয়ের কাছ থেকে জানলাম,যে ফুলটা কোন কানে লাগাচ্ছে, মানে বাম না ডান কানে, তাই দিয়ে বোঝা যায়, সেই কর্ণফুলি মহিলাটি বিবাহিত না কুমারী। আমার নিজের দেশের মেয়েদের কথা মনে এল। সিঁদুর আছে না'কি শুখি মাঙ? কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে বিশেষ, বিবাহের পরে, এই সিঁদুর পরা নিয়ে,পারম্পরিকতার মর্য্যাদা রক্ষার কোন দায়বদ্ধতা নেই - আজকাল। তারা সুহাগন হবার অন্য যা কিছু রীতি রেওয়াজ ছিল, যা সামান্য কোথাও কোথাও এখনও কারো কারো মধ্যে বজায় আছে, সেটুকুও মানেন না। এটা ফেমিনিস্ট মতবাদ। যাই হোক, এই মান্যতা নিয়ে যদি কেউ খর্ব বোধে ক্লিষ্ট হয়, তাকে অনর্থক বুঝিয়ে ওঠার কোনও রকম তার্কিক, ধার্মিক এমন কি সাংবিধানিক কচকচি করতে চাই না। এ যুগের সব কিছুই আত্মকেন্দ্রিক। মৌলিক অধিকার নিয়ে সকলেই টনটনে জ্ঞাত/ জ্ঞাতা, কিন্তু জাত্যাভিমান বলে অবশিষ্ট আর কিছু নেই। সেটাই বেদনার।

নিজের নিজের সিট কাম শোবার জন্যে রূপান্তরিত বার্থে, জায়গা নিতে নিতেই, ডিনারে কি খাব, ড্রিংকসে কি নেব, আগামীকাল সকালে ব্রেকফাস্টে কি নেব- সব জানার জন্যে সেবিকাদের মধ্যে ব্যস্ততা চরমে উঠল। সিটের ওপরে, তিন খানা সুদৃশ্য প্ল্যাকার্ড রয়েছে - তাই দেখে, বেছে নিয়ে অর্ডার প্লেস করে রাখ। নির্দিষ্ট সময়ে, তা হাজির হয়ে যাবে।

আমাদের দুজনেরই ভেজ ডিনার ছিল - কিন্তু প্যাঁচানো পাউরুটি, স্যুপ, চানা ভাত(রাজমা টাইপ) এবং পরোটা ছাড়া, বাকি আরোও দুটো আইটেম মুখে দিয়ে মজা পেলাম না। এ ছাড়া চার রকম ফ্রুটসের চারখানা বড় বড় পিস ছিল, যা খুবই ফ্রেশ এবং সুমিষ্ট ছিল। আনারস, আপেল, পাকা পেঁপে এবং আরেকটি অজানা ফল। এর পরে কফি ছিল, যা আমরা নিই নি। আমরা ড্রিংকসও নিই নি। শ্যামল*দা সাথে থাকলে - হয়ত ভোদকা- স্প্রাইট ট্রাই করতাম। তবে সত্যি বলতে, নিজের শরীরের ওপর এখন চোখ বুঁজে ভরসা করতে পারি না। তা ছাড়া, সাথে মেয়ে রয়েছে।

এ ছাড়া প্লেনের দীর্ঘ যাত্রা পথে, বেশি কিছু বলার নেই। আমার ঠিক পাশের জোড়া সিটে, বেশ বয়স্ক এক ভদ্রলোক এবং তার স্ত্রী ছিলেন। তারা কোন দেশিয় বলতে পারব না। তবে ভদ্রলোক ১০ ঘন্টার প্রথম পাঁচ ঘন্টা ড্রিংকস নিয়ে লাগাতার ব্যাস্ত ছিলেন। ভদ্রমহিলার কিছুটা হাতের কাঁপুনি ছিল -পারকিনসন্সের আরলি স্টেজ, কিন্তু উনিও কফি খেয়ে গেছেন টানা।

আর যেটা ঘটল, তা ছিল একমোদ্বিতীয়ম- আমার সিট, বেডে কনভার্ট হল না - আমারই মত দরকচা মার্কা হয়ে আটকে রইল। সেটাকে অ্যাডজাস্ট করতে, বিমানের সকল সেবক- সেবিকার শেষতম আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কাঁচকলা দেখিয়ে, টস সে মস নেহি হুয়া। সেবকেরা লজ্জায় আধমরা হয়ে যান। ইটস পিকুলিয়র, ইট নেভার হ্যাপেনড - বারবার এই বলতে থাকেন। স্যার, এক্সট্রিমলি সরি উই আর, নো সিটস আর অ্যাভেলেবল। ইউ স্পেন্ট সো মাচ মানি - সত্যিই প্লেনে আর একটা সিটেও এমন অস্বাভাবিকতা দেখা যায় নি।

এইটি ছাড়া আর কোন অসুবিধে হয় নি - যদিও, আমি ভাল মতই শুয়ে, হেলান দিয়ে বসেই, সারা পথ অতিক্রম করেছি।

ভোর চারটে ষোলতে প্লেন নামার আগে, আমাদের রাত সাড়ে তিনটেতে ব্রেকফাস্ট খেতে হল। এত রাতে, প্লেনের জানালা দিয়ে ফিজি আইল্যান্ডের কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় নি- কারণ রাত তখনও পুরোপুরি বিদায় নেয় নি। এমন কি উষাও তার যাত্রাপথে পা রাখে নি।

নান্ডিতে ল্যান্ড করার পরে,প্লেনের দরজা দিয়ে বেরোনর সময় পর্যন্ত, সেবিকার সরি, গুড মর্নিং সব কিছুর এক সাথে ঝাঁপতাল শুনে যেতে হল। ফেরার ফ্লাইটে খুব খেয়াল রাখবে, এটাও বলে ফেললো।

নান্ডি থেকে, আমাদের পরের ফ্লাইট ডোমেস্টিক। তাই এখানে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল অ্যারাইভাল উইং ছেড়ে, ডোমেস্টিক উইং- এ আসতে হল। আমার কল্পনার সাথে, ফিজি আইল্যান্ডের এই বিমান বন্দর, একেবারেই মিল খাচ্ছিল না। আমি হতবাকই ছিলাম। বিশাল এয়ারপোর্ট। আমাদের বিমান এ্যারোব্রিজে গিয়ে লাগল। ফিজি যতটা ছোট ভেবেছিলাম, তা যে নয়- প্রথম বার বুঝতে পেরে বেশ আশ্চর্য হচ্ছিলাম। নান্ডি বিমানবন্দর, ফিজির ইস্ট কোস্টে অবস্থিত। এখান থেকে ছোট ফ্লাইটে আমরা যাব সুভা(suva)। আধ ঘন্টার উড়ান। কিন্তু তার টাইম হল সকাল সাতটা দশে। ৬-ই বেরিয়েছিলাম। আজ ৮-ই এই ঘন কালো ভোরের বেলায়, আমার ঘর থেকে ১০০০০ মাইল দূরে, এক টুকরো দ্বীপের এক বিমান বন্দরে, বসে আছি, অপেক্ষা করছি, এই যাত্রার শেষটুকুকে শেষ করার জন্য। আমার পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে, আমারই ছোট্ট মেয়ে। 


বি.দ্র. ছবি সাইজের হিসাবে দিতে অসমর্থ হলাম। দু:খিত।