এককালে বাস স্ট্যাণ্ডের ধারে চায়ের দোকানে যারা প্লেটের উপর কাপ রেখে চা খেত, গ্রামের ছাপোষা মানুষেরা তাদের 'বাবু' বলে সম্বোধন করত। মফস্বল বা শহরের শিক্ষিত, বিত্তবান এমনকি মাঝারি সাইজের দোকান চালাতো যারা তারাও 'বাবু' ছিল। সেকালে গ্রামের কারোর হাতে দুপয়সা এলে একটু ভালো জামাকাপড় পরলে লোকে বলত (তাচ্ছিল্য করেই) একেবারে 'বাবু' হয়েগেছিস তো রে। গ্রামের মায়েরা তাদের সন্তানদের ভালো হয়ে বসতে হলে বলত - 'বাবু হয়ে' বস তো বাবা। লায়েক ছেলে ড্যাংড্যাং ঘুরে বেড়ালে বলত 'এই ভাবে বাবুগিরি করলে পেট চলবে?'
কুঁজোরও যেমন মাঝে মাঝে শখ হয় চিৎ হিয়ে শুতে, তেমনি গ্রামের কমবেশি সকলেরই সাধ হত বাবুদের মত হতে। এরকমই একজন খেটে খাওয়া দিনমজুর রোজ সকালে কোনদিন পান্তা ভাত, কোনদিন মুড়ি বা রুটি খেয়ে বাসস্ট্যান্ডের পাশে এক চায়ের দোকানের সামনে দিয়ে কাজে যেত। লক্ষ্য করত সেই সব বাবুদের যারা দিব্বি চায়ে কেমন সুন্দর চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজ পড়ে দিন শুরু করে। খুব ইচ্ছে করত একদিন ওদের পাশে দাঁড়িয়ে চায়ে চুমুক দেবে কিন্তু বাধ সাধছিল খবরের কাগজ, ওটা তো পড়ত পারবে না। সাক্ষরতা মিশনের দৌলতে সন্ধ্যের স্কুলে গিয়ে নাম সই করা শিখেছে বটে কিন্তু খবরের কাগজ পড়ার মত জায়গায় পৌঁছাতে আরো অনেক মাইল যেতে হবে।
একদিন মনের ইচ্ছের কথা স্ত্রীকে বলেই ফেলল - একটো কথা শুন ক্যেনি।
-বুলবা তবেই তো শ্যুনবো, বুলো কি বুলবা।
-বুলছি, আমাকে একদিন চা কোরি দিতে পারবি?
-ঊহ, শখ দ্যাখো ক্যেনি, বাবু এসিছে আমার, চা খাবে।
-দিবি নি?
-দুকানে কিনি খ্যেয়ি লিও। খামুখা এক কাপ চা'র ল্যেগি হুজ্জুতি কে কোরবে।
-কিনি খাবো বুলছিস।
ঠিক করল কিনেই খাবে একদিন, চায়ের সঙ্গে খবরের কাগজ সহ ফুল-বাবু না হতে পারলেও শুধু চায়ে হাফ-বাবু তো হবে। সেদিন কাজে যাবার সময় দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আরেকবার ভালো করে দেখেনিল কিভাবে কাপে চুমুক দিয়ে চা খাচ্ছে। বাবু-রা চলে যেতেই একটু এগিয়ে বেঞ্চে বসে বলল - এক কাপ চা দে দ্যেখি।
দোকানকার এগিয়ে দিল চায়ের কাপ, চায়ের কাপ হাতে নিতেই নিজেকে যেন কেমন যেন আলাদা লাগতে লাগল, চাপোষা গরীব চাষী যেন এক কাপে চা হাতে বড়লোক বাবু হয়ে উঠছে। চোখে মুখে আনন্দের ছাপ যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মনে হল আজ হাতে চা নিয়ে যতটা আনন্দ হচ্ছে, গত বছর কৃষি ঋণ মুকুবের খবরেও ততটা হয়নি। অতি যত্নসহকারে কাপ তুলে ঠোঁটে রেখে একটা তুফানী চুমুক, যে চুমুকে প্রায় ৩৩০ মিলিলিটার থাম্পস-আপ সুনামী'র গতিতে মুখের ভেতরে পৌঁছে যাবে সেখানে ওই তো সামান্য এককাপ চা। ব্যাস, মুখের ভেতরে তখন একমুখ গরম চা, জিভ-তালু-মাড়ি'র যেন গনদহন চলছে, না গিলতে পারছে না ফেলতে পারছে। কেন যেন বলেছিল চোখ নাকি মনের আয়না, এ বেচারার চোখ তো মুখের আয়না হয়ে উঠেছে। চোখে যেন হড়পা বান ডেকেছে, গামছা দিয়ে সে বানের জল মুছে নিতে নিতে ভাবল বাবুরা তো দিব্বি খায় রোজ।
ভারাক্রান্ত মনে দোকানদার কে বলল - কাজটো ভালো করলিনি, আমি গরীব ব্যুলি গরম চা দিলি!
©হাসিবুর রহমান