সমস্যা এলে ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর মন টা দার্শনিক হয়ে যায়। আমি ব্রক্ষ্মজ্ঞানী! বাড়ির লোক আমায় আদর করে ব্রক্ষ্মজ্ঞানী বলে। ওরা চাইলেই আমি জগৎ সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে গুছিয়ে সুচিন্তিত মতামত দিয়ে থাকি, তাই। দশটি বাক্যে কথা শেষ করা গেলেও অন্তত কুড়িটি বাক্যে শেষ করি, এবং তারপর জিজ্ঞেস করি, বুঝেছ/বুঝেছিস না আরো বলবো? না চাইলে অবশ্য দি না, আমার সময়ের দাম আছে, ভাববেন না ভণিতা করে ‘ছাদ বাগান’ গ্রুপে সদ্য পরিচিত বন্ধুনীর পিসতুতো ভাসুরের মাসতুতো শালীর কথা বলছি।
যেকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সমস্যা এলে ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর মনটাও দার্শনিক হয়ে যায়। সোজাসাপটা কথাও একটু টেনে টেনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি, উদাসীন ‘টোন’এ। কেউ বায়ো চাইলে লিখি 'শান্ত-শিষ্ট ভীতু টাইপের মানুষ, অনেকের মাঝে নেই হয়ে থাকার কৌশল জানি, অন্যের কথা শুনে গোপন রাখতে জানি, আর জানি খেতে।’ এই যেমন এখন বাড়ি খুঁজছি। মনমতো পাচ্ছি না, তাই বলে চিন্তার পাহাড় নিয়ে বসে আছি? একেবারেই না। এই বাড়ি দেখার চক্করে বরং শহরটার গলি ঘুঁজি চেনা হয়ে যাচ্ছে। শুনুন, সমস্যা এলে প্রথমে মনকে পেড়ে ফেলে। মন নিজেই নিজেকে বলে, 'ওহ্, আবার গেরোয় পড়লি?’ একটু থিতু হয়ে আরেকটা মন বলে, ‘তা, এসো বাবা, বসো বাবা, এসেই যখন পড়েছ তখন দুটো দিন থেকেই যাও! আমি সহাবস্থানে বিশ্বাসী!' এবং এই সহাবস্থানের ভাবনা থেকেই এতদিন দিব্যি ঘর করেছি ধূলো-বালি, ঝুল, মাকড়সা, আরশোলা, চেয়ারের ওপর স্তূপীকৃত জামাকাপড়, এভারেস্টের উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়া বইএর 'পর বই, কেতরে পড়ে থাকা কুশন, কোঁচকানো সোফার কভার, সেন্টার টেবিলের ওপরে শুয়ে থাকা ব্যাগ-ছাতা-ঝোলা-লোশান এবং প্যারাসিটামল। একে আলস্য বললে বলতেই পারেন আপনারা। কিন্তু ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর বয়ানে যদি বলতে হয় তবে আমি এক গর্বিত ল্যাদখোর। সাতচল্লিশ চলে গেল গতহপ্তায়, আর বছর কুড়ি দৌড়লেই ফিতে ছুঁতে পারবো, দেন, টা টা বাই বাই। এ ক'টা বছরের জন্য নিজেকে পাল্টে ফেলা বোকামি।
ভাবছিলেন সত্যিকারের সমস্যার কথা বলবো? পাগল! সমস্যার কথা বলে পরিবেশ ভারাক্রান্ত করার পক্ষপাতী নই। আমার সব ছুটকো ব্যাপার।
মহাজন বলে গেছেন 'চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ', আমি তো দেখি কেবল দুখের পিঠে দুখ! সুখ কই? একটার পর একটা সমস্যা আন-এন্ডিং রিলে রেসের মতো চলছে গত কয়েক বছর, একটা কিছু ঠিকঠাক হলেই আর একজন দৌড়ে আসে হাতেপায়ে লাগাম পরিয়ে দৌড় করাবার জন্য! ওফ!
যাগ্গে যাক! এসব জীবনের অঙ্গ, ওভারলুক করে এগিয়ে যেতে হবে ফাইনাল ডেস্টিনেশানে। বাবা বলতেন, 'ও ঠিক আছে।' 'ও' মানে 'পরিস্থিতি'। আমির খান বলেছে 'অল ইজ ওয়েল' আর ব্রক্ষ্মজ্ঞানী মেয়েকে বলে 'ধৈর্য ধর, শেষমেশ কিছু ভালোই হবে'।
ভালোর কথা মনে পড়ায় মনে পড়লো, একটা নভেল পড়েছিলাম, ‘পলিয়ানা’ নামে। অনেকেই জানবেন। বিখ্যাত লেখা। চলচ্চিত্রও আছে। ১৯১৩ সালে এই বইটি লিখেছিলেন Eleanor H Porter. পলিয়ানা একটি ছোট্ট মেয়ে যে অসম্ভব আশাবাদী ছিল। তার প্রিয় খেলা ছিল ‘glad game’. সে সবকিছুর মধ্যেই এমনকি খারাপ কিছু হলেও তার মধ্যে থেকে ভালো কিছু খুঁজে নিতে জানতো। খুব ভালো লেগেছিল নভেলের বিষয়বস্তু। গল্পে পলিয়ানা মেয়েটি চার্চ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিল একজোড়া ক্রাচ, সম্ভবত বড়দিনের উপহার ছিল, সে বলেছিল, আই অ্যাম গ্ল্যাড যে এটা আমাকে ব্যবহার করতে হয়না। আমি এতটাই ইনফ্লুয়েন্সড হয়েছিলাম যে এতগুলো বছর পরেও খারাপ কিছু হলে মনের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, 'ইটস ওকে। এর চেয়ে খারাপ হতে পারতো!' এবং এই বিশ্বাসটা এতটাই বাড়াবাড়ি রকমের বেশী যে বাবা চলে যাওয়ার পর প্রাথমিক শোক সামলে ওঠার পর মনে হয়েছিল, এটাই ঠিক হলো, বাবা থাকলে আরো কতটা কষ্ট পেতেন! অ্যাডিনো কার্সিনোমার থাবায় বাবা ছ মাসের মধ্যে নেই হয়ে গেলেন! আমি বাবার কাছে ছিলাম না শেষ সময়ে, তখন ভাবিনি হঠাৎ সব শেষ হয়ে যাবে। একঘন্টা আগে পৌঁছে গেলেও বাবা আমাকে দেখতে পারতেন! এত বছর পরে মনে হয়, বাবা কি আমাকে বলে যেতেন কিছু? হয়তো বলতেন, 'মাকে, ভাইকে দেখো…সংসার কোরো মন দিয়ে, বড়দাদাকে মানুষ কোরো'…নাকি বলতেন, 'আমি ভালো হয়ে যাবো, চিন্তা কোরো না' কিংবা কিছুই বলতেন না। বাবার সাথে না কাটানো এই শেষ সময়ের অনেক কাল্পনিক কথোপকথন মাথায় ঘোরে। হয়তো সারাজীবন ফাইট করে জিতে যাওয়া বাবার অসুখের কাছে এই নতজানু সমর্পণ দেখতে চাইনি, যৌবনে ফুটবল খেলা বাবার সুঠাম শরীরের কাঠ হয়ে যাওয়া শরীর মনে রাখতে চাইনি! অথচ বারবার বিদায়বেলার ছবি চোখে ভেসে ওঠে। এইসব ভাবনা পীড়া দেয়। উত্তর না পাওয়ার কষ্ট সাংঘাতিক। ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খায় ভেতরে ভেতরে। যে সব মানুষের সাথে আর কথা হবেনা বা যাদের সাথে আর কথা বলবো না বলে স্থির করা আছে তাদের সাথে নিরন্তর কথা চলে মাথায়। অবশ্য এটা মন্দ নয়, কথোপকথন নিজের ইচ্ছে মতো সাজিয়ে নেওয়া যায় বেশ। আমি জানি সামনের ব্যক্তি কী কী বলতে পারেন আমার প্রশ্নের উত্তরে তবু তার মুখে আমার শুনতে চাওয়া কথা গুলো বসাতে মন্দ লাগে না। ট্রাই ইট সামটাইমস।
গতকাল একটা জাপানি শব্দ শিখেছি। Wabi-Sabi. Wabi-Sabi refers to an aesthetic philosophy and vision applied to objects, which alludes to beauty in imperfections and the value of the passage of time, and openly accepts the deterioration and transience of existence, both human and material. Wabi-Sabi আর্ট ফর্ম নিয়ে দেখছিলাম, এটা গোটা দুনিয়া খুলে গেল যেন। এর যুতসই কোনো বাংলা নেই বোধহয়, তবে মোদ্দা কথাটা হলো finding beauty within the imperfections of life. এই ল্যাজে গোবরে হয়ে থাকা জীবন থেকে রূপ-রং-রস খুঁজে নেওয়া। এভাবেই ভালো থাকতে হয়, অনেক অনেক না পাওয়ার মাঝে ছিঁটেফোঁটা প্রাপ্তিতেই হাসিমুখে থাকতে শেখা। ব্রক্ষ্মজ্ঞানীর বাণী আপাতত এটুকুই, পরে কথা জমলে আবার গপ্প হবে’খন।
পুনশ্চ: ছবিটা বাড়ি খুঁজতে গিয়ে তোলা। বাসস্ট্যান্ড এ। মনে হলো সমস্যা যতোই বড় হোক, এভাবে পোষ মানিয়ে নিলে দিব্যি চলে যাবে...😅