নিজের নির্ধারিত সিটে বসেই কুবের ফোঁত করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে দেখলেন পাশের সিটের অনিমেষ সান্যাল তাঁর দিকে ভ্রুকুটি নিয়ে তাকিয়ে আছেন— “এরকম ঝোড়ো কাকের মতো উড়তে উড়তে এলে? ব্যাপার কী?” কুবের আঙুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে আলগোছে উত্তর দিলেন— “আর বোলো না। সকাল-সকাল ঝামেলায় পড়েছি।” সান্যাল তাঁর কুড়ি বছরের সহকর্মী। প্রায় দিনই পাশাপাশি বসে অফিসে যান। সংসারের মোহমায়া, স্ত্রীর মুখঝামটা, সরকারের স্বজনপোষণ, বিরাট কোহলির তিরিক্ষি মেজাজ— এই সব নিয়েই সুখ-দুঃখের কথা হয় একটু-আধটু। তাই আজকের ক্রেডিট কার্ড কাণ্ডের কথাও বলেই ফেললেন কুবের।
ঘটনা শুনে সান্যাল চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন কুবেরের দিকে— “আমি তখনই বলেছিলুম কিন্তু। ওই ফাঁদে পা দিওনি। শুনলে আমার কথা? কোথাকার কে মেয়ে, জানা নেই, শোনা নেই; তার মায়ের কিডনি অপারেশনের জন্যে তুমি ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ফেললে।” কুবের সংশোধন করে দিলেন— “মায়ের অপারেশন নয়, দিদির। বিধবা দিদির।” সান্যাল নাক দিয়ে ঘোঁৎ করলেন একটা— “ওই হল। মা অন্ধ। বিধবা দিদির কিডনি ফেল। আর ভাইয়ের হাত উড়ে গেছে বোম বাঁধতে গিয়ে। এ যেন হিন্দি ফিলিম দেখছি। আর তার মধ্যে তুমি হয়েছ ত্রাতা। ফাদার ফিগার।” এই নিয়ে সান্যাল আগেও তাঁকে কথা শুনিয়েছেন। তাই কুবের এই প্রসঙ্গ এড়াতে জানালার বাইরে মনোনিবেশ করলেন। সান্যাল তবু ছাড়ার পাত্র নন— “তখন খুব তো ক্রেডিট কার্ড গছিয়েছিল। এখন তাকে ফোন করে বলো কেমন বাঁশটা খেয়েছ তুমি।”
মেয়েটার নাম মল্লিকা। কী করে তাঁর ফোন নাম্বার পেয়েছিল কে জানে। একদিন রোববার দুপুরে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল— “স্যর, আপনার ক্রেডিট কার্ড দরকার?” কুবের খাওয়া-দাওয়ার পাট সেরে সবে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়েছেন। মেয়েটা ক্রেডিট কার্ডের মহিমা ব্যাখ্যান যা করল, তার অর্ধেক কানের বাইরেই থেকে গেল। যেটুকু ঢুকল তার পুরোটাই আবার কান থেকে গড়িয়ে বালিশে পড়ে গেল। ফোনটা কোনওমতে কাটতে পারলে বাঁচেন, তাই আলগোছে দু-চারটে ‘হুঁ-হাঁ’ করে ফিরে গেলেন দিবানিদ্রায়।
‘না’ বলতে পারাটা যে মানুষকে কত বড় ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাতে পারে সেটা কুবের টের পেলেন পরের দিন। অফিসে একগাদা ফাইলের মধ্যে ডুবে আছেন; এক মহিলার ফোন এল— “স্যর, মল্লিকা বলছি। আপনি ডকুমেন্টগুলো এনেছেন তো?” কুবের আকাশ থেকে পড়লেন— “কীসের ডকুমেন্ট?” ফোনের ওপ্রান্তে মল্লিকা বেশ ক্ষুব্ধ— “আপনার ক্রেডিট কার্ডের ডকুমেন্ট। কাল কথা হল যে?” ভাতঘুমের আবছা স্মৃতি হাতড়ে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে কুবের ব্যস্ততা দেখালেন— “আমার এখন অনেক কাজ। আপনি পরে ফোন করুন।” ওদিক থেকে করুণ স্বর ভেসে এল— “কিন্তু স্যর আপনি যে কাল বলেছিলেন আপনার অফিসে আসতে। আমি কতদূর থেকে এলাম। আবার ফিরে যাব?”
মেয়েটা তাঁর অফিসের উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। কুবের রাস্তার দুদিক দেখে নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলেন। এই আপদ এখনই ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। ক্রেডিট কার্ডের মতো সৌখিন জিনিস তাঁর মতো ছাপোষা লোকের জন্যে নয়। টাকাপয়সা প্লাস্টিকের হলে নেহাতই খেলনা মনে হয়। তিনি কাছে আসতেই মেয়েটা তার কাঁধের ঝোলা থেকে ফস করে একটা ফর্ম বের করল— “স্যর এই ফর্মটাতে আপনাকে তিন জায়গায় সই করতে হবে। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। সাথে প্যান কার্ড, পাসপোর্ট বা ভোটার আইডি কার্ড...” মেয়েটাকে থামিয়ে দিয়ে কুবের দৃঢ় গলায় বললেন— “দেখুন দিদিমণি, আমার ক্রেডিট কার্ডের দরকার নেই। কাল বোধ হয় আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম, তাই আপনাকে অফিসে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু সত্যি করেই আমার কোনও কার্ডের...” কথা শেষ করতে পারলেন না কুবের। তার আগেই মেয়েটা ফোঁপাতে আরম্ভ করেছে।
“আপনি প্লিজ একটু ভাবুন স্যর, বাড়িতে চারজন মানুষ আমরা। একা আমাকে সংসার চালাতে হয়। মা আগে সেলাই শেখাত, এখন চোখের অসুখে আর দেখতেই পায় না। বাবা চলে যাওয়ার আগে দিদির বিয়ে দিয়েছিল, সেও বিধবা হয়ে গেল। এখন তার কিডনির অসুখ। একটা ভাই। কুসঙ্গে পড়ে সেও গোল্লায় গেছে।” কুবের পড়লেন মহা ফাঁপরে। মেয়েটা কথা বলতে বলতে ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে কাঁদছে। তাঁর মতো মধ্যবয়স্ক মানুষের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা তরুণী বোধ হয় খুব একটা শুভ লক্ষণ নয়। আশেপাশের পথচারীরা ঘুরে ঘুরে দেখছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিয়ে একটু নরম গলায় বললেন— “দ্যাখো মল্লিকা, এইভাবে কেঁদো না। এই নাও।” মানিব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বললেন— “এটা রাখো। বাসভাড়া।” মেয়েটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে টাকাটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করল— “আপনি সত্যিই কার্ডটা করাবেন না? আপনারটা হলেই এ মাসে পঞ্চাশটা হয়ে যেত। দিদির অপারেশান করাতে টাকার খুব দরকার।”
কুবের মেয়েটাকে ভালো করে দেখলেন এতক্ষণে। এলোমেলো চুল, চোখে মুখে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট, পরনে একটা ছাপা সালোয়ার কামিজ, হাতের সরু কব্জিতে একটা সস্তা ঘড়ি। কেমন মায়া হল। তাঁর ছেলে পুলুরই বয়সি হয়তো। এই বয়সে এই একা মেয়েকে সংসার চালাতে হচ্ছে। একটু দোনামনা করে জিজ্ঞাসা করলেন— “কার্ডটা নিলে কী ব্যবহার করতেই হবে? আমার তো ক্রেডিট কার্ড কোনও কাজে লাগে না। বুঝতেই পারছ।”
দিন দশেকের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর অফিসের ঠিকানায়। মল্লিকার কথা এখন মনে পড়ে যেতেই কুবের মোবাইল থেকে তার নাম্বারটা খুঁজে বের করলেন।
দু-চারবার রিং হতেই ওদিক থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল— “কে বে?” কুবের আন্দাজ করলেন, নিশ্চয় মল্লিকার বখাটে ভাইটা। গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর হলেন— “মল্লিকা আছে?” ওপারের ব্যক্তিটি একটু থমকে জিজ্ঞাসা করলেন— “কী দরকার?” কুবের একই স্বরে বললেন— “সেটা মল্লিকাকেই বলব। ফোনটা দিন।” ওদিক থেকে ঘ্যাসঘ্যাস করে হাসি ভেসে এল— “আমাকে টপকে মল্লিকা, চন্দনা, রেশমা কাউকে পাবেন না। কী দরকার আমায় বলুন। আর যদি মাল দেখার পরে টাকাপয়সার কথা বলতে চান, আমার অফিসে চলে আসুন। পুরো ক্যাটালগ নামিয়ে দেব।”
ফোন কেটে সান্যালের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হাসলেন কুবের— “মনে হয় মল্লিকার নাম্বার বদলে গেছে।”