ফিজিতে দিন কয়েক 

৪

দেখতে দেখতে, আমার ফিজিযাত্রা-র এক সপ্তাহ পুরো হয়ে গেল। এখানে পৌঁছানোর পরে, তৃতীয় দিনে, মেয়ে অফিস বেরিয়ে যাবার পর, আমি আর জামাই দুজনে বেরোলাম বাজারে যাব বলে। ওয়াইলোকুতে ঘরের কাছে, তেমন ভাবে বাজার লাগে না- সামান্য লোকাল শাক সবজী, চাষীরা নিয়ে বসে। আমাদের উদ্দেশ্য কোন স্পেশালিটি আইটেমের বাজার করা যদিও ছিল না, আমাকে এখানকার বাজার দোকান সম্বন্ধে একটা ধারনা দেওয়াই ছিল আসল কারণ।

ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে কল করে, জামাই ট্যাক্সি ডেকে নেয়। ফোন করে, নাম, কোথা থেকে কোথায় যাব বললেই, ট্যাক্সি দুমিনিটের মধ্যে তোমার কাছে উপস্থিত হবে। আজ বুধবার, লোকালাইজড ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও হচ্ছে। গায়ে লাগে না, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকলে মাথা ভিজবে। আমার মাথায় স্বাভাবিক কভার নেই, তাই আমি ছাতা নিলাম। গাড়িতে, বাজার এলাকায় পৌঁছে দেখি, বৃষ্টি একেবারেই নেই। বেশ আরাম করে, আমরা বাজার ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কলকাতার সাথে বিশেষ তফাত নেই। যদিও কলকাতা একশো ভাগ ট্রপিকাল আবহাওয়ার আওতায় নেই - কিন্তু ফিজি পুরোপুরি ট্রপিকাল, রেইনফরেস্ট বিশিষ্ট উদাহরণ ট্রপিকাল দেশের। এখানে এক্সট্রা আইটেম হিসাবে, বাজারে দারুন আনারস, তরমুজ, কাপ্পা বলে একরকমের ফল (ছোট কমলালেবুর মত), এগুলি বিশেষ চোখে পড়ল। এখানে লেবু (lemon) গুলি বেশ বড়। কলা কাঠালি কলা সবেচেয়ে বেশি। পেঁয়াজ সাদাটে। আলু প্রায় কালো। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের শাক-পাতা ইত্যাদি।

তবে,ফিজি আইল্যান্ডের প্রধান ও সবচেয়ে জনপ্রিয় ভেজিটেবল বা সবজি হলো কাসাভা (Cassava) এবং টারো বা ডালো (Taro/Dalo). এগুলো মূলত স্টার্চ বা শর্করা সমৃদ্ধ শিকড়জাতীয় সবজি (Root Vegetables), যা ফিজির মানুষের প্রধান খাদ্য (Staple Food) হিসেবে প্রতিদিনের খাবারে আলুর মতো ব্যবহৃত হয়. কাসাভা অনেকটা আমাদের কলকাতার মানকচুর মত, কিন্ত আরো শক্ত। চিপস খেয়ে দেখেছি - বেশ শক্ত, দাঁতে জোর লাগে। 

ফিজির প্রধান সবজিগুলোকে মূলত দুটি ভাগে দেখা হয়:

১. প্রধান শিকড়জাতীয় সবজি (Root Crops):

কাসাভা (Cassava / Tavioka): এটি ফিজির সবচেয়ে সাধারণ ও জনপ্রিয় সবজি. স্থানীয়ভাবে একে 'তাভিওকা' বলা হয়। এটি সেদ্ধ করে, পুড়িয়ে বা ভেজে (চিপসের মতো) খাওয়া হয়। এটিকে শিমূল আলুও বলা হয়। 

ডালো বা টারো (Dalo / Taro): এটি ফিজির ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবজি। মে মাসে ফিজিতে 'টারো ডে' বা ডালো দিবসও পালন করা হয়। আমাদের কলকাতা বা পশ্চিমবাংলার গ্রামের বড় বড় কচু গাছ গুলি যেমন। 

মিষ্টি আলু (Kumala / Sweet Potato) ও ইয়াম (Yam / Uvi): এগুলোও ফিজির মানুষের অন্যতম প্রধান প্রিয় সবজি।

২. প্রধান শাকসবজি ও অন্যান্য (Green Vegetables)

রৌরৌ বা টারো পাতা (Rourou / Taro Leaves): ডালো বা টারো গাছের সবুজ পাতা ফিজিতে শাক হিসেবে প্রচুর খাওয়া হয়। নারকেলের দুধে এই পাতা সেদ্ধ করে 'রৌরৌ' এবং 'পালুসামি' (Palusami) নামক অত্যন্ত সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী পদ তৈরি করা হয়। 

বেলে (Bele): এটি ওশেনিয়া অঞ্চলের একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ঐতিহ্যবাহী সবুজ শাক, যা দেখতে কিছুটা পালং শাকের মতো। ফিজির প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এটি খাওয়া হয়।

বেগুন (Baigan / Eggplant) এবং ঢ্যাঁড়শ (Okra): ইন্দো-ফিজিয়ান (ভারতীয় বংশোদ্ভূত ফিজিয়ান) সংস্কৃতির প্রভাবের কারণে ফিজিতে বেগুন ও ঢ্যাঁড়শ ব্যাপকভাবে চাষ এবং খাওয়া হয়।

দুরুকা (Duruka): একে 'ফিজিয়ান অ্যাসপ্যারাগাস' বলা হয়। এটি ফিজির একটি বিশেষ ও অনন্য সবজি, যা দেখতে অনেকটা আখ বা কচি বাঁশের মতো এবং নারকেলের দুধে রান্না করে খাওয়া হয়।

(সোর্স : ফেসবুক পেজ,ক্যাপ্টেন কুক ক্রুজ-ফিজি এবং উইকিপেডিয়া২)

এগুলি ছাড়া, বাজারের একটা অংশে যেটা ভর্তি তা হল, একধরনের শিকড়, যার স্থানীয় নাম কাওয়া (kava)। কাওয়া (Kava)—যা ফিজিতে স্থানীয়ভাবে 'ইয়াকোনা' (Yaqona) বা 'গ্রগ' (Grog) নামে পরিচিত—হলো ফিজির ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় পানীয়। এটি গোলমরিচ গোত্রের একধরণের উদ্ভিদের (Piper methysticum) শুকনো শিকড় গুঁড়ো করে তৈরি করা হয়। ফিজির সামাজিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই পানীয়টির অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। (সোর্স : ফিজি ট্যুরিজম পেজ থেকে, ছবি সহ)

এই ট্যুরিজম পেজেই, কাওয়া বানানো এবং খাবার নিয়ম পদ্ধতি নিয়ে ছোট একটি নোট পাই, যা ইংরাজীতে ছিল। আমি অনুবাদ করে এখানে দিলাম- যারা উৎসাহী তাদের পড়ার জন্য। কারণ আপনি যদি ফিজি ভ্রমণে যান, তবে তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে একটি ঐতিহ্যবাহী কাওয়া অনুষ্ঠানে (Tourism Fiji) অংশ নেওয়া অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কাওয়া কী এবং কীভাবে তৈরি হয়?

উৎস: কাওয়া উদ্ভিদের শিকড় রোদে শুকিয়ে প্রথমে মিহি গুঁড়ো করা হয়। 

প্রস্তুত প্রণালী: এই গুঁড়ো একটি বিশেষ কাপড়ে (Straining cloth) নিয়ে ঠান্ডা পানির সাথে মেশানো হয়। এরপর হাত দিয়ে চেপে চেপে মাটির রঙের একটি তরল নির্যাস বের করা হয়।

পরিবেশন: ঐতিহ্যগতভাবে এটি 'তানোয়া' (Tanoa) নামক একটি কাঠের বড় পাত্রে তৈরি করা হয় এবং 'বিলো' (Bilo) নামক নারকেলের মালা বা বাটিতে পরিবেশন করা হয়। 

🧠 এর স্বাদ ও শারীরিক অনুভূতি

স্বাদ: কাওয়ার স্বাদ বেশ তেতো এবং মাটির মতো। এটি মোটেও কোনো মিষ্টি বা সুস্বাদু পানীয় নয়।

অনুভূতি: এটি কোনো অ্যালকোহল নয়, তবে এটি পানের পর মুখে ও জিহ্বায় একটি অবশ বা অসাড় অনুভূতি (Numbing sensation) তৈরি হয়। কাওয়া মনকে শান্ত ও শিথিল করে এবং পেশির ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।

🤝 সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান (Sevusevu)

ফিজিতে কোনো অতিথি বা পর্যটক যখন কোনো ঐতিহ্যবাহী গ্রামে যান, তখন গ্রামের প্রধান বা চিফকে (Chief) সম্মান জানিয়ে কাওয়ার শিকড় উপহার দিতে হয়, যাকে 'সেভুসেভু' (Sevusevu) বলা হয়। এটি ফিজিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধন এবং সামাজিক সখ্যতার প্রতীক। 

🥥 কাওয়া পানের কিছু নিয়ম (Etiquette)

আপনি যদি ফিজিতে কোনো কাওয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তবে স্থানীয় সংস্কৃতি বজায় রাখতে নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করতে হয়: 

পোশাক: মার্জিত পোশাক পরতে হবে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই কাঁধ এবং হাঁটু ঢাকা থাকতে হবে (ফিজির ঐতিহ্যবাহী স্কার্ট 'সুলু' পরা ভালো)। জুতো, টুপি ও সানগ্লাস খুলে বসতে হবে। 

গ্রহণ করার নিয়ম: যখন আপনাকে এক বাটি (Bilo) কাওয়া দেওয়া হবে, তখন জোরে একবার হাততালি দিয়ে কাপটি হাত বাড়িয়ে নিতে হবে এবং বলতে হবে "বুলা" (Bula) (ফিজিয়ান ভাষায় স্বাগতম বা শুভকামনা)। 

পান করা: চুমুক দিয়ে না খেয়ে পুরো বাটির কাওয়া এক টানে বা এক ঢোকে শেষ করতে হয়। 

ফেরত দেওয়া: খালি বাটিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় তিনবার হাততালি দিতে হয় এবং বলতে হয় "ভিনাকা" (Vinaka) (যার অর্থ ধন্যবাদ)। 

স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে (আমার মেয়ের বাড়ির কমপ্লেক্সের সিকুরিটি গার্ড যেমন) জানতে পারি, কাওয়ার নিজস্ব স্বাদ মাটি মাটি। সেটাকে এক নারকোলের বাটি থেকে এক ঢোঁকে, কি ভাবে কেউ খেতে পারে? তাও আবার স্বাদে তেঁতো। আমি দেশীয় প্রথায়, সম্মান জানাচ্ছি- কিন্তু আমি ঐতিহ্যবাহী কাওয়া অনুষ্ঠানে না যাবারই, আপ্রাণ চেষ্টা করব। মনে পড়ে গেল, কারমাটারে, একবার ফিল্ড করার সময়( তালচের গ্লেসিয়েশনের ওপর), আমি একজন রেলওয়ে কর্মী, যিনি পি এল আই পদে ছিলেন- বাঙালি, তার বাসায় থাকতাম। তাকে এক সাঁওতাল বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিল-সঙ্গে আমাকেও। আমি বিয়ের জাঁকজমক আর পদ্ধতি দেখতে উৎসুক ছিলাম। তখন আমি পি এইচ ডি-র ছাত্র, আই আই টি খড়্গপুরে। সেই বিয়ের ভোজে, সাপের মাংস বিশেষ পদ ছিল। প্যান্ডেলের কাপড়ের ফাঁক দিয়ে, আমি পালিয়ে ছিলাম। প্রামাণিক-দার বাড়ির কাছেই, মধুপুর- কলকাতা রেল লাইনের ধারে সেই বিয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ভুলি নি। সাপের মাংস না'কি অবিকল মাছের মতই লাগে। 

যাক এসব। ফিজি থেকে বিদ্যাসাগরের শেষ জীবনের নিবাস স্থানে পৌঁছে গেছি। তবে পি এইচ ডি আমার করা হয় নি। সে সব অন্য কথা। সেই প্রফেসরও আজ বেঁচে নেই। 

শাকসবজীর বাজার দেখে, এবং জামাইয়ের দরকারের সব কিছু কিনে, আমরা গেলাম মাছের বাজারে। একমাত্র, পারশে, পমফ্রেট ছাড়া বাকি মাছ ছিল অজানা। না, হাঙর বা তিমি ছিল না। ছিল না কোন নৃশংসতার আভাস বা চিহ্ন। সব মাছ গোটা ছিল। বরানগর মাছের বাজারের মত, সিমেন্টের বাঁধানো সব দোকান গুলি। মাছের বাজার সুভা পোর্ট সংলগ্ন। এক ধরনের মাছ দেখলাম- যার মাথা থেকে পেটের অর্দ্ধেক পর্যন্ত পায়রার গলার মত সবুজ- আবার ল্যাজের একটু ওপর থেকে ল্যাজের পাখনা গুলি পর্যন্ত ডিপ সবুজ রঙের। এখানে প্যারট ফিশ বলে। 

সবজি বা মাছের বাজারের কেউই অরিজিন্যাল ফিজিয়ান নয়, এরা সকলেই ইন্দো ফিজিয়ান। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা চিনি-বাগানে কাজের জন্য ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়ে আসে; তাদের বংশধররা Indo-Fijian। এই বিশেষ শ্রেণীর আগমনের ফলে, ফিজির ডেমোগ্রাফির এক বিরাট পরিবর্তন হয়। সেই সব কথা হবে আগামীতে। 

ক্রমশ...

পুন: যারা পড়ছেন বা পড়বেন, তাদের কাছে একটাই অনুরোধ, আপনাদের কোন ব্যাপারে কিছু বলার, জানার থাকলে বিনা সংকোচ করে, মন্তব্যে লিখুন৷ আমি তার উত্তর দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করব - যা হবে অথেনটিক। এখান থেকে ফিরে যাবার পরে, সব কিছুই আবার বই বা নেট ভিত্তিক হয়ে যাবে। এখন জিজ্ঞাসা করে ঘোড়ার মুখ থেকে জানতে পারব। ধন্যবাদ সকলকে৷