কত রকম ভয় নিয়ে যে বেঁচে থাকতে হয়! খুব ছোট্ট থেকেই জুজুবুড়ির ভয়, দুষ্টুমি করেছ মানে আর রেহাই নেই, জুজুবুড়ি এসে সাংঘাতিক কিছু ‌একটা করে ফেলবে! আর একটু বড় হলে ১.ভূত-প্রেত(অন্ধকারে যায় না, ভূত আছে), তারপর ২. ভগবান( ভগবান সব দেখছে, পাপ দেবে কিন্তু! মাই ফুট!) তারপর ৩. দুষ্টুলোক, ছেলেধরা(কাঁধের বস্তায় ভরে নিয়ে যাবে), ৪. মাতাল(নড়বড়ে পায়ের লোকের দিকে তাকাতে হয়না), ৫. ক্ষ্যাপা ষাঁড়( ষাঁড় দেখতে পেলে আর রক্ষে নেই, পেটে দুটো ফুটো করে দেবে গুঁতিয়ে….গোটা ছোটবেলা ভয়ে ভয়েই কেটে‌ গেছে মাইরি! জানিনা, বাঙালি মা মাত্রেই কী এত ভয় দেখায়? নাকি শুধু আমার মা ই? আমি অন্তত মেয়েকে জুজুবুড়ি,ভূত-ভগবানের ভয় দেখিয়ে বড় করিনি। দুষ্টুলোকের ভয় দেখাতে হয়েছে, সাবধান করতে হয়েছে/হয়, কিন্তু আজ সে প্রসঙ্গে যাচ্ছিনা।

 

আমি খুব ভয় পাই শুঁয়োপোকা দেখলে। দেখলেই আগে বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে! কত রকম যে শুঁয়োপোকা দেখেছি আর মিনি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার ক'টা ফিরিস্তি দেব আজ, তাতে যদি এই মাঝবয়সে এসেও ভয়টা কমে! 

আমার বাবার বাড়ির পাড়াটা মহানন্দা নদীর ধারে। ছোটবেলায় প্রায়দিন বিকেলবেলায় মা আর পাড়ার কাকী, পিসিদের সাথে নদীর ধারে যেতাম। আমাদের পাড়ার সীমানা বরাবর মাটির বাঁধ দেওয়া ছিল। বেশ উঁচু, ওঠার পর গড়গড়িয়ে নেমে যেতাম নদীর চড়ায়। যতদূর চোখ যায় সবুজ মাঠ, উত্তর দিকটার নীল পাহাড়(চম্পাসারি, হঠাৎ কলোনীর দিকটায়), আর মাঠের শেষে নদী। বেশ জল থাকতো তখন। বরফ ঠান্ডা মহানন্দার জল, আর যেখানে স্রোত একটু কম সেখানে নদীর নীচের পাথর,নুড়ি, বড় বড় বোল্ডার, ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙাচী ইত্যাদি দেখা যেত। এর মধ্যে ভয়ের তো কিছু নেই! তাহলে এ কথা বলছি কেন? বলছি, কারন মহানন্দার পাড়ে বাড়ি ছিল বলে মাটি ছিল অত্যন্ত ভালো আর সবার বাড়িতেই ছিল‌ গাছ গছালি। আমাদের বাড়িতেই ছিল নারকেল, সুপুরি, পেয়ারা, আম, কাঁঠাল, জাহাজী কলা, পেঁপে গাছ। এতে ফল হতো। আর ছিল জলপাই, তেজপাতা,বাতাবিলেবু, আতা, শিশু গাছ। গেটের পর থেকে ঘরের সামনে পর্যন্ত দুদিকে লাইন ধরে পাতাবাহার। ফুল গাছের মধ্যে ছিল রঙ্গন, গোলাপ, দোলনচাঁপা, মাধবীলতা। এগুলো মাটিতে লাগানো। ঠিক ঘরের সামনে টায় একটা চা গাছ। আর মরশুমী ফুল তো ছিলই। আর ছিল শুঁয়োপোকা, মিলিয়নস অফ দেম!

সবচেয়ে সাংঘাতিক দিয়ে শুরু করি। আমাদের পাশে মিতা দিদিদের বাড়িতে ছিল গামারি গাছ। গামারি কাঠ যেমন ভালো, তেমন তাতে শুঁয়োপোকাও হতো! একদম গোড়া থেকে শুরু হয়ে ওপর পর্যন্ত! একটু গরম পড়লে মানুষের মতো‌ ওদেরও গা বোধহয় চিড়বিড় চিড়বিড় করতো, আর সব গাছ থেকে নেমে এদিক ওদিক যাত্রা করতো। হালকা umber রং এর, খুব রাগী দেখতে...আর জলদি জলদি হেঁটে যেত খুদি খুদি পায়ে। ওগুলো‌ গায়ে লাগলে ফোস্কা পড়ার মতো হয়ে যেত! আমরা পেছন দিকের জানালাটা খুলতামই না গরম কালে। তবুও মাঝেমধ্যেই টান‌টান করে পাতা বিছানায় তাদের দেখা যেত! কি যন্ত্রনা! প্রত্যেক বছর কাকু একদিন গাছের গোড়ায় কেরোসিন তেল গেলে সব শুঁয়োপোকা ‌পুড়িয়ে দিত। আবার বেশ কিছুদিন নিশ্চিত। 

এদিকে আমাদের গাছে হতো কালো‌ কালো‌ মোটা আপাত হার্মলেস শুঁয়োপোকা। ওগুলো দেখলেই মা মেরে ফেলতো। হয়তো বিকেলে কাজ টাজ সেরে বারান্দায় নিশ্চিন্তে বসে আছি, দেখি ঠিক আমার হাত খানেকের মধ্যেই উনি আসছেন...আগে তো 'আউ' বলে চিৎকার দিয়ে ছিটকে গেছি অনেক টা, তারপর মা ওটার ভবলীলা সাঙ্গ করেছে। তেজপাতা গাছে হতো মোটা মোটা সবুজ রোম ছাড়া পোকা। ওগুলো ‌থেকে প্রজাপতি হতো। খুব একটি নীচে দেখতাম না, দৈবাৎ কোনো পাখীর মুখ থেকে পড়ে গেলে তবেই দেখতাম। আর‌ ডাল, পাতা কাটা হলে‌ পাতার মধ্যেকার গোলগোল ফুটো দেখে বুঝতাম, তিনি ছিলেন। 

 চা গাছের শুঁয়োপোকা ‌খুব সুন্দর দেখতে। প্রায় চা ফুলের মতো। হলুদাভ সাদা, বড় বড় রোম, ওগুলো মারতে ইচ্ছে করতো না, তবে গাছ থেকে নেমে ঘরের দিকে হাঁটা দিলে নো মার্সি! মাধবীলতা গাছে একাধিক প্রজাতির পোকা হতো। শুঁয়ো ছাড়া কালো, সবুজ। আর শুঁয়োওয়ালা কালো, ছাইছাই। পাখী আসতো ঐসব খেতে। পাখী এলে‌ বুঝতাম গাছে পোকা হয়েছে। সেগুলো আবার মাকড়সার জালের মতো তন্তু বানিয়ে ঝুলতো! এবং যেহেতু গেটের ওপর ছিল গাছটা, মাঝে মাঝেই গায়ে মাথায় আবিষ্কার করতাম! কি যন্ত্রনা! 

গোলাপ গাছে হতো অদ্ভুত রকমের শুঁয়োছাড়া পোকা। সেগুলো খুব নজর না করলে বোঝা যেতনা। একদম গাছের সরু ডালের মতো, দু কর লম্বা, এবং এরা মুখ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকতো। আমার খুব বিশ্রী লাগতো এগুলোকে। 

স্কুলে যাওয়ার পথে আর একটা গামারি গাছ ছিল, পাড়াতেই, প্রধাননগরে ওঠার মুখে। মা বলে দিয়েছিলো কখনও গাছের নীচে দিয়ে যাবিনা। ঐ বাড়ির লোকেরা কখনও শুঁয়োপোকা মারতো না, আর শুঁয়োগুলো হাওয়ায় উড়তো। একদিন বেমালুম ভুলে গিয়ে গাছের নীচে দিয়ে স্কুলে গেছি। যেতে যেতেই চুলকানি শুরু, আর স্কুলে গিয়ে দুহাত চাকা চাকা হয়ে ফুলে গেল! সে কি অসহ্য অবস্থা। আমার বন্ধু সুদেষ্ণা নুন নিয়ে এসেছিল স্কুলের উল্টোদিকের বাড়ি থেকে, সেই নুন দিয়ে হাত ডলে খানিক কমেছিল! আমার ভীষণ অপছন্দের গাছ গামারি।

আর একবার ক্লাস টুএলভে, নাকি ইলেভেন এ, নীহার স্যারের বাড়িতে পড়তে গেছি, উনি আমাদের স্কুলের উল্টোদিকের পাড়ায় থাকেন তখন। স্কুলে হিস্ট্রী পড়াতেন, তো স্যারের কোয়ার্টারে বাইরের বারান্দাটা ঘিরে ওখানে টেবিল আর বেঞ্চ পাতা ছিল। আমি বসেছি একদম কোনায়, লেট করেছিলাম প্রথমদিন, তাই ঘুপচিতে! হঠাৎ ঘাড়ে খোঁচা মতো লাগলো, হাত দিয়ে দেখি কিচ্ছু নেই! তারপর...ওরে বাবা! দেখি কোলের ওপর একটা কালো‌ শুঁয়োপোকা! সে ও পড়ে গিয়ে ভয় পেয়ে গোল্লা হয়ে রয়েছে। স্যার কে চিঁ চিঁ করে বললাম! তারপর বাইরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এলাম! এদিকে বুকের ভেতর হাতুরি পেটা হচ্ছে! 

আর মামারবাড়ী গেলে তো কথাই নেই! পাট কাটা হচ্ছে…..গোটা গ্রামে শুঁয়োপোকা! উঠোনে ডাল মাড়াই হচ্ছে...বাড়িময় শুঁয়োপোকা! এদিকে জিকাগাছ, ওদিকে সজনে গাছ, কোনায় কুলগাছ...ভর্তি শুঁয়োপোকা! বুকের মধ্যে ঢেঁকির পাড় আর হাতুরি পেটা!

এখনও শাকপাতায়, মটরশুঁটির মধ্যে পোকা পেলে ভয় পাই। পারতপক্ষে ফুল টুল কিনি না। পোকা থাকবেই। গ্যারেন্টি। আমার ছোট্ট বাগানেও হয়, সেগুলোকে অতটা ভয় করেনা অবশ্য। আমার মেয়ে ভয় পায় না। ওর প্রথম গল্পের বই 'The very hungry caterpillar' , হয়তো এ জন্যই ভয় পায়না । ওকে দেখাবার জন্য একবার একটা শুঁয়োপোকা পেলেছিলাম, সে পাতা খেয়ে মোটকু হয়ে গুটি বানিয়েছিল। একমাস ধরে লক্ষ্য করেছিলাম দুজনাই, কিন্তু কেমন হয়েছিল পরে দেখতে পাইনি! চুপচাপ উড়ে গিয়েছিল।


যতক্ষণ লিখছিলাম ততক্ষণ খ্যাসর খ্যাসর করে গা চুলকে গেলাম! পড়ে যদি কারুর গা চুলকোয় তবেই আমার লেখা সার্থক! অন্তত আমার সমব্যথী কাউকে পাব! দেওয়া ছবির সাথে লেখার সম্পর্ক বলতে ওটা আমার বাগানের ফুল। যিনি উড়ে বসেছেন তিনি আমার প্রিয়। ওনাকে ভয় নেই।