এক সোমবার সকালে কুবের সেন আবিষ্কার করলেন তাঁর ক্রেডিট কার্ড চুরি গেছে।
কুবের টিভির সামনে বসে কপালভাতি করছেন, ফোনটা এল। ব্যাঙ্কের ফোন। এক সুমধুরভাষিণী সুপ্রভাত ইত্যাদি জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “স্যর, আপনার দু মিনিট সময় পাব এখন?” সকাল সাতটার সময় ১০ সেকেন্ড সময় মেলাও মুশকিল। টিভির পর্দায় বাবা কুমারানন্দের দেখাদেখি কপালভাতি শেষ করে সোজা বাথরুম। দাড়ি কেটে, স্নান সেরে ঠিক সাড়ে সাতটায় তিনি খাবার টেবিলে। চিঁড়ে-কলা-চিনি মাখিয়ে হাপুস-হুপুস শব্দে জলখাবার সেরেই কুবের অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ান বাসস্ট্যান্ডের দিকে। আটটার বাসটা ফসকে গেলে মুশকিল – অফিস পৌঁছতে এখন পাঁচ মিনিট এদিক-ওদিক হলেই খচাং করে অর্ধেক দিনের মাইনে কাটা যায়। নতুন বসের মেজাজ টাকের কয়েক ইঞ্চি ওপরে চড়ে থাকে সবসময়।
কিন্তু কী আর করা? মোবাইলের ওদিক থেকে মিষ্টি করে এক ভদ্রমহিলা দু মিনিট চাইছেন। তার ওপর ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করছেন। তার মানে আজ কপালভাতিটা গেল। এই সাত সকালেই এরা অফিসে পৌঁছায় কী করে? ব্যাজার মুখে টিভিটা বন্ধ করে কুবের বারান্দায় এলেন – “বলুন ম্যাডাম।”
ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে বললেন – “স্যর, আপনার ক্রেডিট কার্ড বিল এখনও ডিউ। কাল বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। কালকের মধ্যে বিল জমা না দিলে লেট ফাইন দিতে হবে।” এহেন মিছরির ছুরি কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করার আগেই কুবের মনে করার চেষ্টা করলেন গত চার-পাঁচমাসে ক্রেডিট কার্ডে আদৌ কিছু কিনেছেন কি না। এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন – “ঠিক আছে ম্যাডাম, আমি টাকা জমা করে দেব।” তারপরই মনে পড়ল অফিসের ঠিকানায় ‘ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট’ লেখা একটা লেফাফা প্রতি মাসেই আসে বটে; কিন্তু যেহেতু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছেন, তাই সেগুলো আর খুলে দেখা হয় না। এ মাসেরটাও তাঁর টেবিলের হাজার কাগজপত্রের আড়ালে কোথায় যে পড়ে আছে, কে জানে। তাই জিজ্ঞাসা করে ফেললেন – “কত বিল এসেছে বলবেন একটু?” ওদিক থেকে এবার মোক্ষম তিরটা এল – “আপনার মোট ডিউ আছে আঠাশ হাজার তিনশো একুশ টাকা। লেট ফাইন এড়াতে কালকের মধ্যে অন্তত ছ হাজার পাঁচশো টাকা পে করতে হবে। হ্যাভ এ গুড ডে।"
ফোনটা রেখে কুবের ধাতস্থ হতে সময় নিলেন। এত টাকা কীভাবে খরচ হল? শেষবার বিল মেটানোর পর তিনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারই করেননি।
মাস ছয়েক আগে পুজোর সময় পুরী যেতে ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন রেলওয়ের সাইট থেকে। কেটেছিলেন মানে তাঁর অফিসের দাশগুপ্ত কেটে দিয়েছিল। দাশগুপ্ত সেলস্-এ ঢুকেছে বছর দুয়েক, দারুণ চটপটে ছেলে। ট্রেনের টিকিট কাটতে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হবেন শুনে তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল কোন ওয়েবসাইটে গিয়ে কী করে টিকিট বুক করতে হবে। শেষে ডেঁপোমি করে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল – “ইন্টারনেটের মতো জিনিস হয় না সেনদা। ট্রেনের টিকিট হোক বা সগ্গের। একটা ক্রেডিট কার্ড থাকলেই কেল্লা ফতে।” ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টিকিট কাটো, পরের মাসে বিল এলে ব্যাঙ্কে গিয়ে একটা চেক জমা দিয়ে দাও।
ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল কুবেরের। তাঁদের বাড়ির কাছেই একটা শপিং মল মাথাচাড়া দিয়েছে বছরখানেক হয়ে গেল। সেদিন অফিসফেরতা স্বপনের সবজি দোকানটা পাশ কাটিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন ঝাঁ-চকচকে সেই শপিং মলে। নামটা জবরদস্ত – ‘স্বপ্নবাজার’। পুরো পাঁচতলা জুড়ে স্বপ্নের সওদাগরি। শাক-সব্জি, মাছ-মাংস, রান্নার হাঁড়ি-বাসন থেকে আরম্ভ করে জামাকাপড় – সব আছে।
একটা শপিং কার্ট টেনে নিয়ে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের সবজি কিনলেন। দু হাতে দুটো ক্যারি প্যাকেটের ভারে হাতের শিরা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু কেনাকাটার শেষে টিভিতে দেখা সুদর্শন মডেলের মতো মানিব্যাগ থেকে ফস করে ক্রেডিট কার্ডটা বাড়িয়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনায় ওটুকু কষ্ট কিছুই নয়। কাউন্টারের ওদিকের মেয়েটা মিষ্টি হেসে তাঁর কার্ডটা নিয়ে ঘষে দিল একটা গাবলু মার্কা যন্ত্রে আর তারপর বাড়িয়ে দিল পেমেন্ট রিসিপ্ট। দু-হাতে গাবদা দুটো প্যাকেট নিয়ে দরজার দিকে এগোতেই ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান হাসিমুখে দরজা খুলে দিল। ক্রেডিট কার্ডের কী মহিমা! সরকারি অফিসের ছাপোষা কেরানিকেও মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। কেন যে এই লাইনটা ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে না? “মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ!” হাঁচোড়-পাঁচোড় করে হাতের বোঝা দুটো নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে কুবের নিজের ভাবনায় পুলকিত হয়ে উঠলেন।
কিন্তু পরের মাসের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট হাতে পেয়েই কুবেরের মনে একটা কুটিল প্রশ্নের উদয় হল – মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ নাকি মুহূর্তের জন্যে বাদশাহ? তিনজনের পুরীর রিটার্ন টিকিট বাদ দিয়েও, চারবার স্বপ্নবাজারে বাদশাহগিরি, একটা সওনা বেল্ট আর একটা ফুট ম্যাসাজার। শেষ দুটো বস্তু তাঁর গিন্নির আবদারে টিভির বিজ্ঞাপন দেখে কেনা। বেল্টটার প্রথমবার ব্যবহারেই কোমর আর শিরদাঁড়ার ব্যথায় দুদিন শয্যাশায়ী ছিলেন বলে ম্যাসাজারটাতে পা দিতে সাহস পেলেন না। তাঁদের কাজের লোক পঞ্চার মা বহুদিন ধরে একটা কাঠের পিঁড়ের জন্যে ঘ্যানঘ্যান করছিল। এখন ওই ফুট ম্যাসাজারে বসে সে আনাজ কাটে, কাপড় কাচে।
সেই প্রথম এবং শেষবার কুবের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। বিল চোকাতে জমানো টাকাতেও হাত দিতে হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন কার্ডটা পুড়িয়ে ফেলবেন বা মাটিতে পুঁতে দেবেন। কিন্তু অসময়ে কাজে লাগতে পারে ভেবে কার্ডটার অন্তিম সংস্কার না করে কাউকে কিছু না জানিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছিলেন শোবার ঘরের বাঙ্কের ওপর। বাতিল একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে পুরোনো কিছু খবরের কাগজ আর পত্রিকার মধ্যে একটা খামে মুড়ে। এই ক-মাসে তিনি ক্রেডিট কার্ডটার অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।
ফোন রেখে কুবের হাজির হলেন শোবার ঘরে। মনের মধ্যে বুদবুদের মতো হাজারটা কী, কোথায়, কেন-র ওপরে ঘুরছে একটা বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন – কে?
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করার মতো বদখেয়াল গিন্নির হবে না। তাহলে কি পুলু? তাঁর ছেলে পুলু সবে কলেজে ভরতি হয়েছে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েদের বাবার ক্রেডিট কার্ডের মতো নির্ভার পাখনার প্রয়োজন হয়। বাঙ্ক থেকে বাক্সটা চটজলদি নামিয়ে কয়েকটা কাগজ এদিক-ওদিক সরিয়ে খামটা পেয়েও গেলেন। যেভাবে রেখেছিলেন, সেভাবেই সেলোটেপ আঁটা আছে একেবারে। কাঁপা-কাঁপা হাতে খামটা ছিঁড়তেই তার পেট থেকে বেরিয়ে এল একদা তাঁর গলায় ফুটে থাকা হাড় – ‘কুবের সেন’ লেখা প্লাস্টিকের সেই আশ্চর্য চিরাগ। কার্ডটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ের চোখে সেটা উলটে-পালটে দেখছেন, হঠাৎ গিন্নি হাজির – “সক্কাল-সক্কাল এই ময়লাগুলো ঘরে না ফেললেই নয়? পঞ্চার মা আজ আসবে না। আমার ঘর মুছতে মুছতে দুপুর হয়ে যাবে। আর কাজ না বাড়িয়ে চান করতে যাও।”
চান করতে করতে কুবের চিন্তায় ডুবে গেলেন। তাঁর ক্রেডিট কার্ড খোওয়া যায়নি। গত চার-পাঁচ মাস ধরে খামবন্দি পড়ে আছে। অথচ ওই কার্ডে তাঁর বকেয়া আঠাশ হাজার টাকা! নিশ্চয় ব্যাঙ্ক থেকে কোনও গন্ডগোল করেছে। আর কারও ক্রেডিট কার্ড বিল তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। কুবের ঠিক করলেন এদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কড়কে দেবেন।
হঠাৎ দরজায় গুমগুম ঘুষি – “বাবা, তোমার হল? আমার কলেজ যাওয়া হবে না আজ আর।” পুলুর মুষ্ট্যাঘাতে কুবেরের সম্বিত ফিরল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে জামাপ্যান্টে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে কোনওরকমে নাকে-মুখে দুটো গুঁজেই ছুটলেন বাস ধরতে।