মধ্যমগ্রাম বাজারে সারাবছর নারকেল পাওয়া যায়। সে আপনি বলতেই পারেন, মধ্যমগ্রাম কেন, আমাদের চন্ডীদাস মার্কেটেও পাওয়া যায়, আসলে আমাদের এখানে যেন নারকেলগুলো ডাকাডাকি করে, ‘আসুন দিদি, আসুন কাকী, নিয়ে যান গোটা দুই, ডালে খান, কচু শাকে খান, মানকচু বাটায় খান, মালাইকারি খান…খান, খান, খান…’; তা দরদাম করে আর সাহস হয়নি। কুড়ি টাকার কচুশাকের জন্য পঞ্চাশটাকার নারকেল? তখন পালা-পার্বণের সময়। নারকেল গাছের মতো নারকেলের দামও আকাশ মুখো, তাই হাতে করে আনা হয়নি। তা পৌষ সংক্রান্তির সময় বাবলি যখন বললো ওর পাড়ায় সস্তায় নারকেল পাওয়া যাচ্ছে তখন আর দেরী করিনি। ফাঁকিবাজ হলেও সুগৃহিনী আমি, বরের পকেটের খেয়াল রাখি। এককথায় আনতে দিলাম পাঁচ খানা। তারপর শুরু হলো এই গল্প।
নারকেল দেখে মনখারাপ হওয়ার যোগাড়! একটা মাত্র সুস্থ স্বাভাবিক, বাকীগুলো অপুষ্টিতে ভুগে ভোগে যাওয়া! কোথায় আমার বাবার বাড়ির গাছের ইয়া বড় বড় ফল, আর কোথায় এই পঞ্চমুষিক! বাবলিকে বললাম, দ্যাখো বাপু, এইরকম গোড়া লেবুর মতো নারকেল এনেছ, এতে আমি একশ টাকার বেশি একপয়সাও দেবনা! সে বেচারী নিজেও অপ্রস্তুত, ভাবেনি খোসা ছাড়াবার পর এমন জিনিস বেরোবে। তারপর সেই নারকেল কিছুদিন গড়াগড়ি খেল মেঝেতে। হপ্তাখানেক পর পুঁচকে একটা ফাটিয়ে মানকচু বাটা খাওয়া হলো। দেখলাম ছোট হলেও মালাই আছে পুরু আর মিষ্টি। ভাবলাম এতটাও হতচ্ছেদ্দা করার কিছু হয়নি, ফন্দি জানলে তিল তিল করে পয়সা জমালে টাকার পাহাড়ও তৈরি করা যায়, নেহাৎ আমার জানা নেই তাই! এদিকে জানুয়ারি মাস পুরো চলে গেল রসরাজের পাটিসাপটা খেয়ে। মধ্যমগ্রামের ‘রসরাজ’ এর পাটিসাপটা যিনি খাননি তাঁর কথা ভাবলেও কষ্ট তাই ভাবছি না, আমি এবং আমরা রীতিমতো লাইন দিয়ে গরম গরম অতীব সুস্বাদু স্বর্গীয় এই সোজাসাপটা বস্তুটি গলধঃকরণ করেছি, দোকান থাকতে বাড়িতে কেন! কে খাটে! তাই যেখানকার নারকেল সেখানেই ছিল বসে। এবার গরম পড়তে শুরু করেছে, ভাবলাম এবার যদি কিছু না করি তাহলে বাকি আশি টাকা জলে যাবে। তাই আজ, একটু আগে নাড়ু বানানোর দুঃসাহস দেখিয়ে ফেলেছিলাম। একটা পচা বেরোলো। মানে কুড়ি টাকা জলে। তারপর বাগড়া দিল গ্রাইন্ডার। যতই ঘোরাই না কেন, নারকেলের টুকরোগুলো আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে যেন বলতে লাগলো, ছোট বলে হেয় করেছিলে না, দ্যাখো কেমন সাজা! দিলাম ঢেলে চিনি। এবার একটু নম্র ভাব দেখা গেল। আবার ঘ্যারররররর্….মিক্স মিক্স মিক্স। ভয়ানক শব্দ। সেটা থামলেই সেক্রেটারী অব স্টেটস এর স্যালারী, পাবলিক সেক্টর, প্রাইভেট সেক্টর ইত্যাদি কঠিন কঠিন জিনিসপত্র পড়ার আওয়াজ। কাল বোধহয় স্কুলে টেস্ট আছে। এরপর দিলাম দুধ ঢেলে, যদি মিহি হয়! তা হলো, বেশ কয়েক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচা করে নারকেল মিহি হলো। কড়া চাপলাম। বিশ্বাস করুন তার দু তিন মিনিটের মাথায় মনে হলো, এ আমি কি করলাম! এই ভর সন্ধ্যায় ফোনালাপ না করে নাড়ু পাকাতে বসলাম! তাও আবার রেসিপি না দেখে! কেন! চিনির নাড়ু ঠিকঠাক হওয়া এক দূরহ ব্যাপার, কেন করতে গেলাম। আরো না জানি কতক্ষণ সময় দিতে হবে ভেবেই রান্নাঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ফেললাম। ওদিকে ঘর থেকে আর পড়ার শব্দ আসছে না। পরীক্ষার্থী কি মধুপুরে পৌঁছে গেল? হাঁক দিলাম, ‘কি রে, আওয়াজ পাচ্ছি না কেন?’ শুরু হলো, ‘.....টু প্রমোট সোশ্যাল প্রগ্রেস….' এদিকে গ্যাসের পাশ থেকে সরলেই নারকেলে লালচে ছোপ। নাম্বার কাটা গেল। যে খুন্তি মাখনের নাড়িয়ে মতো ঝোল ঝাল নামিয়ে ফেলি সেই খুন্তি হয়ে গেছে ভারী! বাহুবল যেমন লাগছে, বাহুতেও তেমন লাগছে। ঘাড়ে টনটন, হাঁটুতে কনকন। বুঝলাম দিদা আমার কেমন আরামে বসে রান্না করতো। উঁচু খুর লাগানো পিঁড়ি। মাঝখানে ফুলের নকশা করা। বড়মামা গো! তুমি আমার জন্য একটা পিঁড়িও রাখলে না! যাইহোক, সবকিছুই জীবনের নিয়ম মেনে একসময় ফুরিয়ে যায়, নাড়ুও নেমে গেল। যখন গরম গরম নাড়ু পাকাচ্ছিলাম তখন ভাবছিলাম, এত কিছু বেরোয় বাজারে, ব্যাটারা একখান ছ্যাঁকাপ্রুফ গ্লাভস বানাতে পারেনা! বাংলার ঘরে ঘরে এর আশু প্রয়োজন। ঠিক তেমনই হলো যেমন কলেজে পড়ার সময় মায়ের হাতে হাতে গড়তাম। দু হাতের তালু বেয়ে তেল গড়িয়ে পড়ছিল। শুধু রং টা হলোনা। সাদা ফটফটে রং টা করতে পারলাম না। কেউ জানলে বলবেন। হিংসা করে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখবেন না। শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং। মোট ছত্রিশখানা নাড়ু হয়েছে। আকারে প্রকারে নিজস্বতা বজার রাখতে পেরেছে তারা। কারো সাথে কারো মিল নেই, গায়ের রং ফরসা না হলেও মন্দ নয়, অন্তত বাজারি গুড়ের নাড়ুর মতো কালো কেষ্টি নয়। কি বললেন? ‘ডোন্ট বি রেসিস্ট?’ দেখুন ভাইলোগ, আমি কালী কেষ্টর দেশের মানুষ, আমরা বুক বাজিয়ে কালোকে কালো, ফরসাকে ফ্যাটফ্যাটে বলতে জানি, তবে যেটা করবোনা সেটা হলো, কেউ শর্টকাট পদ্ধতি না বলে দিলে নাড়ু ফাড়ুতে আমি আর নেই। নেভার এভার! এখন যাই, ঘাড়ে একটু ভলিনি স্প্রে না করলে আর চলছে না!
পুনশ্চঃ নাড়ুর ছবি মুছে গেছে। অনেকদিন আগের গল্পটা রয়ে গেছে। পড়ার সময় নাড়ু কল্পনা করে নেওয়া যাবে'খন!